বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২০ | ১৬ আশ্বিন ১৪২৭

Select your Top Menu from wp menus

স্মৃতিকথা : প্রণব দা’র স্নেহ-সান্নিধ্য-উৎসাহ আমার সারা জীবনের পাথেয়

মুস্তাফিজুর রহমান
একজন প্রণব মুখার্জি- ইতিহাস, রাষ্ট্র বিজ্ঞান আর আইন শাস্ত্রে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে অধ্যাপনা ও সাংবাদিকতায় কর্মজীবন শুরু করার পরও শেষ পর্যন্ত নিজেকে তুলে এনেছিলেন উপমহাদেশের রাজনীতির শীর্ষে; হয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ ভারতের ১৩তম প্রেসিডেন্ট। একই সাথে তিনি ছিলেন শতকোটিরও বেশি মানুষের ওই দেশটির প্রথম ও একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি। অথচ প্রকৃতপক্ষেই সদ্য প্রয়াত এই মহাপুরুষ ছিলেন ‘অতি সাধারণ এক অসাধারণ মানুষ’র প্রতিকৃতি। কথাটি এই কারণেই বলছি, সম্ভবত বাংলাদেশের সর্বশেষ কোন এক ক্ষুদ্র মানুষ বা সাংবাদিক হিসেবে গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর ১০ রাজাজী মার্গ-এ পরম শ্রদ্ধেয় প্রণব মুখার্জির সরকারি বাসভবনে তাঁর ব্যক্তিগত অতিথি হয়েছিলাম। তখন প্রণব দা’র ইচ্ছাতেই আমি নয়াদিল্লীতে এক সপ্তাহ ছিলাম। ওই সময় তিনি আমার মত বাংলাদেশের একজন অতি সাধারণ মানুষকে যেভাবে গ্রহণ করেছেন, পরম স্নেহ ও সান্নিধ্য দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন তা আমার সারা জীবনের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
দিল্লীতে ওই একটি সপ্তাহের মধ্যে দাদার (প্রণব মুখার্জি) সাথে বেশ কয়েকবার আমার ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, একান্তে আড্ডা এবং নানা কথা-বার্তা হয়েছে। আর এর মধ্যে একদিনতো দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ম্যারাথন আলোচনা করেছেন। তবে ওই আড্ডায় আমি আর দাদা ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। অবশ্য দাদার ডাকে সাড়া দিতে এসে শেষ দিকে আমাদের সাথে আড্ডায় যুক্ত হয়েছিলেন তাঁর এক রাজনৈতিক শিষ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’র (ইনটাক) নির্বাচিত সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট দেবাশিষ দত্ত। দিল্লীতে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা প্রাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার ওই ভদ্রলোক এই একদিনেই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেন। এর পর তিনি নিজের গাড়ি দিয়ে সাউথ ব্লক, লৌক কল্যাণ মার্গ (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকা), রাইসিনা হিল, গান্ধী ঘাট, লোকসভা (সংসদ) ভবন, নিজাম উদ্দিন, দিল্লী প্রেসক্লাবসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান পরিদর্শন ও সাংগঠনিক কাজে আমাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন।
আসলে আমি প্রণব দা’র কাছে গিয়েছিলাম আমার প্রায় ২ যুগের সাধনার ধন ঐতিহাসিক গবেষণা গ্রন্থ ‘বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনেতা’র প্রকাশনা উৎসবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আর এই বিষয়ে আমি কলকাতা থেকেই নানাভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে সব ঠিকঠাক করে নয়াদিল্লী গিয়েছিলাম, মাত্র একদিনের সফরে। ওখানে বেশি দিন অবস্থান করার কোন প্রস্তুতিও আমার ছিলনা। কিন্তু দাদার সাথে সাক্ষাৎ হতেই তিনি তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আমাকে আটকে দেন এবং আমার বাড়ি থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরে সেই নয়াদিল্লীতে তিনি দীর্ঘ এক সপ্তাহ আমাকে ধরে রাখেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারালো একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে আর বাংলাদেশ হারালো একজন আপনজনকে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বরেণ্য রাজনীতিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির মত্যুতে শোকে আপ্লুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি জানান, প্রণব মুখার্জির সাথে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও তার নিজের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন রাজনীতিবিদ ও আমাদের পরম সুহৃদ হিসেবে প্রণব মুখার্জির অনন্য অবদান কখনও বিস্মৃত হবার নয়। আমি সবসময় মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
তবে যে দিন প্রণব দা’র সাথে দীর্ঘ সময়ের আড্ডায় মেতে ছিলাম সেই দিনটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্মরণীয় একটি দিন। ওই দিন হেন বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেননি। আসলে কোন মানুষ পরম সৌভাগ্যবান না হলে এত বড় একজন মানুষের সাথে এমন একান্তে সময় কাটানোর সুযোগ জীবনেও আসে না। তবে বলে রাখা ভাল, তাঁর সাথে আমার যেসব বিষয়ে কথা-বার্তা হয়েছে এর অধিকাংশই তিনি মিডিয়ায় প্রকাশ করতে নিষেধ করে গেছেন। তাই আমি সেই দিকে যাচ্ছি না। অবশ্য আমার সাথে প্রণব দা’র উচ্ছসিত এই আড্ডারও একটি বিশেষ কারণ ছিল, যা আমিও বুঝতে পেরেছিলাম।
ওই সময় দারুণ এক ঘটনার অবতারণা করলেন প্রণব দা। আমাদের সাথে দেবাশিষ দা যোগ দেয়ার পর আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, দেখো দেবা, ওকে আমি ধরে রাখছি, আমার কাজ হচ্ছে; কিন্তু যাওয়ার সময় আমার কাছ থেকে কি নিয়ে যাবে?
দেবাশিষ দা’ও হেসে হেসে বললেন, আপনি যা দেবেন; স্নেহাশিষ, আশীর্বাদ!
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কিছু একটা ভেবে, প্রণব দা তাঁর চিরদিনের ভৃত্য (একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী) হিরা লালকে ডাকলেন। বললেন, রমন কে আসতে বল্তো।
কিছুক্ষণ পরই গলায় ঢাউস মার্কা এক ক্যামেরা ঝুলানো তরুণ বয়সের একজন ফটোগ্রাফার হন্তদন্ত হয়ে দাদার রুমে ঢুকলেন। তখন বুঝতে পারলাম, তার নামই রমন।
এর পর দাদা তাঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে আমার বইটি বের করে আমাকে নিয়ে একটি চমৎকার ফটোসেশন করলেন। একই সাথে আমাকে হোয়াটস এপে ছবি পাঠিয়ে দিতে ফটোগ্রাফারকে বললেন এবং ছবি প্রিন্ট করে পরদিন দিয়ে যাওয়ারও নির্দেশ দিলেন।
১৫-২০ মিনিটে দাদার ওই কীর্তি দেখে আমি এবং দেবাশিষ দা হতবাক! তখন দাদার টেবিলের সামনে আমার পাশেই দেবাশিষ দা বসা ছিলেন। তিনি আমার কানের কাছে তাঁর মুখ এনে ফিসফিস করে আমাকে বললেন, দাদা রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত অসংখ্য বার দেখা হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কোন ফটো নেয়া হয়নি। আজকে আপনার সুবাদে দাদার সাথে কয়েকটা একান্ত ব্যক্তিগত ছবি পেলাম। অর্থাৎ আমার পাশাপাশি দেবাশিষ দা’র সাথেও ফটোসেশন হয়ে গেলো।
খানিক্ষণ পর নিজের টেবিলে আবার শান্ত হয়ে বসে প্রণব দা মজা করে বললেন, জানেন, কোন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, শীর্ষ রাজনীতিক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আমার সাথে ব্যক্তিগত ফটোসেশনের সুযোগ সাধারণত তেমন কেউই পান না। আর বাংলাদেশ বা অন্য দেশের বেলায়তো আরও কম। মজা করে হাসলেন এবং বললেন, তাই, এটিই আপনার জন্য আমার স্পেশাল গিফ্ট।
দাদার এই কথা শুনে আমার চোখের কোনে তখন পানি টলমল করতে লাগলো। আবেগ আপ্লুত হয়ে আমিও বললাম, জি দাদা; আসলেই একটি বিশেষ উপহার। দেবাশিষ দা’ও এই মাত্রই একই কথা আমাকে বলছিলেন।
প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয় জানানো দরকার, সাধারণত ভারতের রাষ্ট্রপতিগণকে সাবেক বলা হয় না, নাম্বার দিয়ে বুঝানো হয়। যেমন- প্রণব মুখার্জি ছিলেন ১৩তম রাষ্ট্রপতি; এর আগে যিনি ছিলেন তিনি ১২তম এবং পরে যিনি এসেছেন তিনি ১৪তম। আর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতিগণের সামগ্রিক নিরাপত্তা, প্রটোকলসহ পুরো জীবনধারা দেশটির সরকারই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তার উপর প্রণব দা’র মতো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেতো কথাই নেই। আর সেই কারণেই আমিও দাদার বাসায় যতবারই প্রবেশ করেছি ততবারই মূল গেটে আমার সাথে থাকা সবকিছু রেখে দিয়ে শুধু পরিধেয় জামা-কাপড় ছাড়া কিছুই ভেতরে নিতে দেয়া হয়নি। তেমনইভাবে ভেতর থেকে একটুকরো কাগজ পর্যন্ত বাইরে আনারও সুযোগ নেই।
বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনেতা : মুস্তাফিজুর রহমান
কলকাতা থেকেই আমি দাদার বাসার সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে গত বছরের ২৯ নভেম্বর বিকেলে আমি প্রথম প্রণব দা’র বাসভবনে পৌঁছে যাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ ওই দিন বিকেলে দাদা গিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদ। ফলে গেটের লোকজন রাখতে না চাইলেও আগে থেকে যোগাযোগের কথা বিস্তারিত জানিয়ে অনেক রিকোয়েস্ট করে একটি চিঠি এবং একটি বই ওখানে দায়িত্বপালনকারী এক সিকিউরিটি অফিসারের কাছে রেখে আসি। তিনিও ভেতরে কারও সাথে যোগাযোগ করেই হয়তো ওসব রেখেছিলেন।
পরদিন সকালে আবার দাদার বাসায় গেলাম এবং জানতে পারলাম আমার বই এবং চিঠি দাদার হাতে পৌঁছে গেছে। গেট থেকে ভেতরে যোগাযোগ করার পর আমাকে বিকেলে আসতে বললেন। যথারীতি বিকেলে গেলাম এবং গেটের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনি পেরিয়ে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম। ওখানে দেখলাম আরও কয়েকজন দর্শনার্থী অপেক্ষা করছেন। ওয়েটিং রুমটি দাদার বাসভবন থেকে আলাদা, সামান্য দূরেও। আর বাসভবনটির সামনে মাঠের মতো বেশ বড় খালি জায়গা, আর পেছনে টেনিস কোর্ট ও সব্জি বাগান। একটু পর পর দাদার বাসভাবনের সরকারি স্টাফরা এসে একজন করে ওয়েটিং রুম থেকে ডেকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। যারা দাদার সাথে দেখা করছেন তারা চলে যাচ্ছেন।
রাত ৯টার দিকে দাদা বেরিয়ে আসলেন ভবনের বাইরে। ভেতর থেকে দাদার একজন স্টাফ এসে আমাকে জানালেন, আজকে আর কারও সাথে তিনি দেখা করবেন না। আমার মনটা অনেক খারপ হয়ে গেলো, মুহূর্তেই। তার পরও বসে আছি। কিন্তু ভাল লাগছে না। ৫-৭ মিনিট পর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম, খালি মাঠের শেষ প্রান্তে দাদা হাঁটাহাঁটি করছেন। একবার ভাবলাম, কাছে যাই। কিন্তু প্রটোকল ব্রেক হওয়ার ভয় জড়িয়ে ধরলো।
ওয়েটিং রুম থেকে বের হয়ে ধীর পায়ে আমি বাইরের গেটের দিকে হাঁটা দিলাম। কোথাও কাউকে দেখছি না; খালি মাঠের এক পাশে দাদা অন্যপাশে আমি। দুজন দুদিকে হাঁটছি। দাদার দিকে তাকিয়ে আমি হাঁটছি। হঠাৎ মনে হলো দাদা আমাকে ইশারা করছেন। আবার ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখলাম, ঠিকই দাদা আমাকে ইশারা করছেন ওয়েটিং রুমে যেতে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ভবনের কার্ণিশ থেকে সিকিউরিটির একজন লোক দৌঁড়ে আমার কাছে এসে আমাকে ওয়েটিং রুমে যেতে বললেন। অনেকটা আশ্বস্ত হয়ে আমি আবার ওয়েটিং রুমে ফিরে গেলাম। দু-এক মিনিটের মধ্যেই দাদা দরজা থেকে ইশারায় আমাকে ডাকলেন।
সামনে গিয়ে কদমবুসি করতেই প্রণব দা আমাকে বললেন, আমি বইটি পড়া শুরু করে দিয়েছি। আপনি থাকেন, দুদিন লাগবে পড়া শেষ করতে। এর পর আপনার সাথে কথা বলবো। তিনি কথা বলছেন আর গেটের উল্টো দিকে হাঁটছেন। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার মাতো দারুন মোলায়েম আলোতে আমিও পাশাপাশি হাঁটছি। আর দাদা মুখের পরবর্তী শব্দ শোনার অপেক্ষা করছি। কিন্তু তিনি আর কিছুই বলছেন না। একটু পর সিকিউরিটি অফিসার এসে দাদাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। দাদা যাওয়ার সময় সিকিউরিটি অফিসারকে আমার থাকার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তড়িৎ নানা দিক ভেবে দাদার সরকারি বাসভবনে থাকার অপেক্ষা না করে আমি চলে গেলাম হোটেলে।
দুদিন পর বিকেলে ফোনে যোগাযোগ করে আবার বাসায় গেলাম। সিকিউরিটির ঝক্কি পার হয়ে সেই ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম। আবার সেই একই দৃশ্য। বেশ কয়েকজন লোক বসে আছেন দাদার সাথে সাক্ষাৎ করতে। এবার শুরুতেই দাদার ব্যক্তিগত স্টাফ এসে আমাকে বাসভবনের ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমাকে দেখে দাদা বেশ খুশিই হলেন। আমাকে টেবিলের সামনে বসিয়ে রেখেই দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ দিচ্ছিলেন। আর ফাঁকে ফাঁকে আমাকে দু-একটি কথা বলছেন। জানালেন, বই পড়া শেষ হয়নি। আমার সাথে আগামীকাল বসবেন। এই সময় প্রাসঙ্গিক আরও কিছু কথাবার্তা হলো। এর পর খুব বেশি দেরি না করে আমি নিজে থেকেই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলাম।
এর পর দিনই আসলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ; দিনটি ছিল ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ মঙ্গলবার। ওই দিন আর কোন দর্শনার্থীকে হয়তো সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়নি। স্টাফদেরও তেমন কাউকে দেখিনি। আলোচনার শুরুতেই প্রণব দা আমাকে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তিনি একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখবেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ কিছু দিন ভাবনায় ছিলেন। আমাকে এবং আমার বইটি পেয়ে তার সেই ভাবনা দূর হয়ে গেছে। তিনি এও জানালেন, বইটি পেয়ে তখন তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছে। পড়ার পর গ্রন্থটিকে যথার্থ হিসেবে মূল্যায়ন করে একে বাংলায় লেখা সমসাময়িককালের একটি চমৎকার, উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক গবেষণা জার্নাল হিসাবে অভিহিত করেন এবং আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন।
অবশেষে দিল্লী থেকে বিদায় নেয়ার সময় আমাকে উৎসাহিত করতে গিয়ে বইটিকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করার পরামর্শ দিয়ে এক কথায় প্রণব মুখার্জি বলেন, এই ঐতিহাসিক গবেষণা জার্নালটির সাথে যদি লেগে থাকতে পারেন তবে এটি আপনাকে বহু দূর নিয়ে যাবে। এই সময় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নতুন একটি নিবন্ধ লেখার বিষয়েও আমার সাথে আলোচনা করেন।
আলোচনার ফাঁকে এক সময় আমি প্রণব মুখার্জিকে আমাদের ভারত-বাংলাদেশ সম্প্রীতি সংসদ ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করি; আমি ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির ট্রেজারার। অতঃপর আন্তঃরাষ্ট্রীয় এই সংগঠনটিকে কিভাবে একটি মজবুত কাঠামো দেয়া যায় সেই বিষয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম খেলা, এত আপন, এত আন্তরিক, এত প্রিয়, এত বড় মাপের জ্ঞানী-গুণি একজন মানুষ আজ আমাদের মাঝে নেই।
প্রণব দা’র স্নেহ-সান্নিধ্য-উৎসাহ আমার সারা জীবনের পাথেয়
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, প্রণব মুখার্জির মৃত্যুতে ভারত হারালো একজন বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে আর বাংলাদেশ হারালো একজন আপনজনকে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বরেণ্য রাজনীতিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির মত্যুতে শোকে আপ্লুত ও স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি জানান, প্রণব মুখার্জির সাথে বঙ্গবন্ধু পরিবার ও তার নিজের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন রাজনীতিবিদ ও আমাদের পরম সুহৃদ হিসেবে প্রণব মুখার্জির অনন্য অবদান কখনও বিস্মৃত হবার নয়। আমি সবসময় মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ভারতে নির্বাসিত থাকাকালীন প্রণব মুখার্জি আমাদের সবসময় সহযোগিতা করেছেন। এমন দুঃসময়ে তিনি আমার পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন, যে কোন প্রয়োজনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেশের ফেরার পরও প্রণব মুখার্জি সহযোগিতা এবং উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক ও পারিবারিক বন্ধু। যেকোন সংকটে তিনি সাহস যুগিয়েছেন।
সেদিনের সেই সুদীর্ঘ আলোচনার ফাঁকে প্রণব দা’র কাছ থেকেই জেনেছিলাম, তাঁর পারিবারিক ডাক নাম পল্টু। এরই মধ্যে অত্যন্ত ভারক্রান্ত মন নিয়ে আমি দেবাশিষ দা’র সাথেও হোয়াটস এপে কথা বললাম। করোনা মহামারীর বাধা না থাকলে হয়তো প্রিয় পল্টু দা’র শেষকৃত্যে আমিও অংশ গ্রহণের চেষ্টা করতাম। যা হোক, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষটির মৃত্যুতে আজ বুধবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে এবং এটিও তাঁর জন্য আমাদের যথার্থ মূল্যায়ন। তাঁর বিদেহী আত্মার অনন্ত শান্তি কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। প্রধান সম্পাদক, এবিএনওয়ার্ল্ড ডটকম।

Related posts