শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১০ আশ্বিন ১৪২৭

Select your Top Menu from wp menus

শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ

অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া

ঘাতকরা হয়নি সফল; মুজিব চেতনায় জাগ্রত, হৃদয়ে স্পন্দিত, শোকাহত-প্রতিবাদী-মুজিব বিপ্লবী জনতা কোটি কোটি। মুজিব মরেনি; মরতে পারে না; শতবর্ষে শেখ মুজিব শতকোটি গুণ শক্তিশালী।

২০২০ সালকে সরকার মুজিব শতবর্ষ হিসেবে পালন করছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’-এর পক্ষ থেকেও বছরব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করা হবে। ১৯২০ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের কোল আলোকিত করেছিলেন বাংলার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি-সংগ্রামের মহানায়ক, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্বনন্দিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যথার্থই বলেছিলেন। ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।/দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান/তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু আমাদের অনুভূতি ও অন্তরাত্মায় মিশে আছেন। শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ। জাতির পিতার প্রতি আমাদের ঋণ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা অশেষ। শেখ মুজিব মানেই বাংলার মুক্ত আকাশ। শেখ মুজিব মানেই বাঙালির অবিরাম মুক্তির সংগ্রাম। শেখ মুজিব মানেই বাঙালি জাতির অস্তিত্ব। শেখ মুজিব মানেই বাঙালির ঠিকানা। শেখ মুজিব মানেই বাঙালি জাতির আশ্রয়-ভরসা। শেখ মুজিব মানেই বাঙালির আদর্শ। শেখ মুজিব মানেই ঝড়-ঝঞ্ঝার মাঝে মাথা উঁচু করে বাঙালির সঠিক পথে চলা।

শেখ মুজিব মানেই বাঙালির মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনা। শেখ মুজিব মানেই সাম্য-অধিকার-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। শেখ মুজিব মানেই দেশের জনগণের প্রতি মানুষের প্রতি ভালোবাসা। শেখ মুজিব মানেই নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। শেখ মুজিব মানেই বাঙালির দিশা- আলোর দিশারী। শেখ মুজিব মানেই তো বাংলাদেশ, স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

১৭ মার্চ যেন বাংলার স্বাধীন রক্তিম সূর্যের অভ্যুদয়: আমি বিশ্বাস করি, ১৭ মার্চ যেন বাংলার স্বাধীন রক্তিম সূর্যের উদয়। বঙ্গবন্ধুই বাঙালির স্বাধীনতার মহানায়ক। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার জন্ম না হলে বিশ্বের মানচিত্রে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতাম না। বঙ্গবন্ধু স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে তিনি কারাবরণ করেন।

পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট চলাকালীন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি ও নেতৃত্বদানের মাধ্যমে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হন। এটাই সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও জন্মদিনকে আমি বাংলার আকাশে স্বাধীন রক্তিম সূর্যের উদয় বলে মনে করি।

তবে বঙ্গবন্ধু শুধু একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে যাননি, স্বাধীন বাংলায় গরিব-দুঃখীসহ তার সাড়ে সাত কোটি সন্তান যাতে বিশ্বে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এ মহতী কর্মগুলো অর্থাৎ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের মহতী কর্মগুলো সম্পাদন করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর। হাজার হাজার ঘটনার মাঝে ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিরাজগঞ্জে এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কয়েকটি লাইন উল্লেখ না করে পারছি না।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘শাসনতন্ত্রে লিখে দিয়েছি যে, কোনোদিন আর শোষকরা বাংলার মানুষকে শোষণ করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।’ ‘আমি বাঙালি। বাঙালি জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই সম্মানের সঙ্গে। আমার রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে, বুদ্ধিষ্ট তার ধর্ম-কর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। তবে একটা কথা হল, ধর্মের নামে আর ব্যবসা করা যাবে না।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, শোষণমুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়াটাও ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আজও শোষণমুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়া বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়ই রয়ে গেছে।

জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা: মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা ছিল সীমাহীন। তিনি বাংলাদেশের জনগণকে নিজ সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের ‘আপনার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা কী’ এ প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি।’ ডেভিড ফ্রস্টের ‘আপনার বড় দুর্বলতাটা কী’- এ প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসি।’ এ কথার মাধ্যমে জনগণের প্রতি জাতির পিতার অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রতি বিশ্বাসেরও বিষয়টিও সুস্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনটাই ছিল যেন মানুষকে ভালোবাসার। দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম দর্শন।

তিনি শুধু জনগণকে ভালোই বাসতেন না, বাংলার জনগণকে নিয়ে তিনি গর্ববোধও করতেন। সে কারণেই ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কবিগুরুর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কবিগুরুর আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। বাঙালি জাতি প্রমাণ করে দিয়েছে যে তারা মানুষ, তারা প্রাণ দিতে জানে। এমন কাজ তারা এবার করেছে, যার নজির ইতিহাসে নাই। ‘হে কবিগুরু আপনি এসে দেখে যান, আমার ৭ কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’ ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের দিন বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, আমি সব ত্যাগ করতে পারি, তোমাদের ভালোবাসা ত্যাগ করতে পারব না।

অকুতোভয় বীর: বঙ্গবন্ধু আমাদের অসীম সাহসিকতার প্রতীক। তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, তিতুমীর, সুভাষ বোস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশ চন্দ্র বসু, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীর মতো সাহসী নেতৃত্বের নির্যাস তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গরিব-দুঃখীসহ সমগ্র বাঙালির সত্যিকারের মহান বীরপুরুষ। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনটাই ছিল সংগ্রামে পরিপূর্ণ। অধিকার আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বহুবার তিনি জেল খেটেছেন। তার জীবনের ১৪টি বছর জেলের মধ্যেই কেটে গেছে।

জাতির পিতা তার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ৫ হাজার দিন কারাভোগ করেছেন। কিন্তু মানুষের অধিকার ও দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে এবং দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে কখনই পিছু হটা তো দূরের কথা বিন্দুমাত্র ভয়ও পাননি। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় নির্জন সেলের সামনে কবর খুঁড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভয় পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অসীম সাহসী বাঙালির নেতা শেখ মুজিব ভয় পাননি; বরং পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে বলেছেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ।

মানুষ একবার মরে, বারবার মরে না। আমি কখনই আত্মসমর্পণ করব না। যদি তোমরা আমাকে মেরে ফেল, মৃত্যুর পর, আমার লাশটা আমার দেশে আমার মানুষদের কাছে পৌঁছাইয়া দিও।’ বঙ্গবন্ধুর এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য তার আপসহীন মনোভাব, অসীম দেশপ্রেমের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অকুতোভয় মৃত্যুঞ্জয়ী মহান বীরের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাঙালি জাতির জন্য রেখে গেছেন।

বিরল নেতৃত্ব, বিশ্বনেতা; হাজারও গুণে গুণান্বিত জাতির পিতা: বঙ্গবন্ধু আমাদের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। বাংলার খোকা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ ডিঙিয়ে কলকাতা ও ঢাকা ছাপিয়ে সমগ্র বিশ্বের বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ে আসন করে নিয়েছেন। বিশ্বখ্যাত কিউবার সংগ্রামী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেখে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, হিমালয়সম মুজিবুর রহমানকে দেখলাম। আমার হৃদয়-মন জুড়িয়ে গেল।’

জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজের অংশ হিসেবে অর্থাৎ বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে মন্ত্রমুগ্ধের মতো উদ্বুদ্ধ করেছিল। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ভাষণ আর দ্বিতীয়টি নেই। বঙ্গবন্ধুর মতো এমন নেতা ও নেতৃত্ব বিশ্বের ইতিহাসে সত্যিই বিরল।

একজন মানুষের মধ্যে যত ধরনের গুণাবলি থাকা সম্ভব, বঙ্গবন্ধুর মাঝে তার সবগুলোই ছিল; যে কারণে বঙ্গবন্ধু আজও আমাদের মাঝে উজ্জ্বল, চিরভাস্বর ও স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত। ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা বঙ্গবন্ধুর অন্যতম মহৎ গুণ। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ছিল ঐন্দ্রজালিক মহাশক্তি। তিনি সফল স্বপ্নদ্রষ্টা, রাজনীতির মহান কবি; তার ভাষণে ছিল অমৃতময় কাব্যিক ব্যঞ্জনা, বাংলা ভাষণে একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মী। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও বাঙালি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সাম্যবাদী, শোষণবিরোধী এবং সুষম অর্থনীতিতে বিশ্বাসী।

সাদাসিধে জীবনযাপন ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চেতনার মূর্ত প্রতীক। নীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন কোমল হৃদয় ও অসীম সহ্য ক্ষমতার অধিকারী। ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনায় সব সময় ছিল তার দেশের জনগণের ও বিশ্বের মানুষের উন্নতি ও কল্যাণ। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম মহৎ গুণ ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা ছিল প্রবল। দেশকে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অবিচল বিশ্বাস।

তিনি ছিলেন বিশ্বের মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষের আদর্শ। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাধারণ ও তার নেতৃত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো জাদুকরি শক্তি ছিল। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে একটুও ভাবেননি। নেতৃত্বের উচ্চতায় ও চরিত্রের দৃঢ়তায় রাষ্ট্রনায়ক জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আর কারও তুলনা করা যায় না বলেই আমি মনে করি। বঙ্গবন্ধু এমন একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব; যিনি ত্যাগের মহিমা ও দেশপ্রেমের কঠিন পরীক্ষায় সম্পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ।

তিনি বাঙালির প্রাণের প্রদীপ ও বাংলার আকাশের স্বাধীনতার উজ্জ্বল নক্ষত্র। বঙ্গবন্ধুই বাঙালির ইতিহাস, সমগ্র বাঙালি জাতি তার কাছে চিরঋণী। তাই আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের বিরল নেতৃত্ব, বিশ্ব নেতা; হাজারও গুণে গুণান্বিত আমাদের জাতির পিতা।

ঘাতকরা হয়নি সফল: আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই- ঘাতকরা হয়নি সফল; মুজিব চেতনায় জাগ্রত, হৃদয়ে স্পন্দিত, শোকাহত-প্রতিবাদী-মুজিব বিপ্লবী জনতা কোটি কোটি। মুজিব মরেনি; মরতে পারে না; শতবর্ষে শেখ মুজিব শতকোটি গুণ শক্তিশালী। প্রকৃতপক্ষে, ঘাতকরা বুঝতে পারেনি, বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। বঙ্গবন্ধুকে সব সময়ই স্মরণ করতে হবে। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে সব সময়ই স্মরণ করবে। এ কথা বললেও ভুল বলা হবে না যে, জীবিত মুজিবের মতো মৃত মুজিবও আমাদের কাছে জীবন্ত, পরাক্রমশালী ও শক্তিশালী।

জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাঙালির সত্তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী, কুচক্রী-যড়যন্ত্রকারীদের সেই অভিলাষ পূরণ হয়নি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। কারণ জাতির পিতা ছিলেন ধর্মীয় চেতনায় একজন সত্যিকারের মুসলমান, তিনি ছিলেন সমাজসেবী, ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, ছিলেন জনদরদি, সাদা মনের সহজ-সরল মানুষ, ছিলেন আদর্শবান সংগ্রামী জননেতা।

বঙ্গবন্ধুর হৃদয় ছিল আকাশের মতো বিশাল। ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন হিমালয় পর্বতের চেয়েও উঁচু। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করায় সমগ্র বাঙালি জাতির হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ঠিকই কিন্তু মুজিব আদর্শ ও চেতনাকে তারা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যায়নি। ইতিহাসের নির্মাতা, গরিব-দুঃখী-কাঙাল বাঙালির স্বপ্নের বীরপুরুষ বঙ্গবন্ধু আজও আমাদের ভালোবাসা ও ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।

এ দেশের লাখো কোটি শ্রমিক, কৃষক, গরিব মানুষ বঙ্গবন্ধুর জন্য আজো নীরবে নিভৃতে কাঁদেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়, বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ বাঙালির ভালোবাসা কতটা শক্তিশালী। কোনো মানুষই চিরকাল বেঁচে থাকবে না। তবে সমগ্র বাঙালির মাঝে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ চিরদিনই বেঁচে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অন্যতম বিষয় হল অসাম্প্রদায়িকতা ও উন্নয়ন; কৃষক-শ্রমিকসহ সবাই মিলে একটি সমতাভিত্তিক সোনার বাংলা গড়ে তোলা। বর্তমান প্রজন্মসহ সমগ্র দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্য পূরণেই দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এর মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়, বিশ্ব নেতা, বিরল নেতৃত্বের অধিকারী জাতির পিতাকে কুচক্রীমহল যে হীন উদ্দেশ্যে হত্যা করেছিল, তাদের সেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি এবং ঘাতকরা সফল হয়নি; বরং বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্তের ঋণ শোধ করতে বর্তমান সময়ে বাংলার কোটি কোটি জনতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুত রয়েছে। যদিও বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের রক্তের ঋণ, যা বাঙালি জাতি কোনোদিনই শোধ করতে পারবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মুজিব আদর্শ বাস্তবায়নের বছর: বঙ্গবন্ধু বাংলার বন্ধু, মানুষের বন্ধু, বিশ্ববন্ধু। বঙ্গবন্ধু আমাদের রক্তঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা, আদর্শ, নীতি, জীবন, শিক্ষা ও চিন্তা আমাদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। মুজিব আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি কথা উল্লেখ করতে চাই।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে চাইলে সোনার মানুষের দরকার। তাহলেই সোনার বাংলা গড়তে পারব। বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘ভাইয়েরা বোনেরা আমার, দেশে একদল লোক সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জীবনভর আমি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। স্বাধীতার জন্য এ দেশের মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। রক্ত দিয়েছে একটা আদর্শের জন্য।

জাতীয়তাবাদ, তোমরা বিশ্বাস কর এটা হল, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তা তোমরাও কর। শোষণহীন সমাজ, সুষম বণ্টন, সম্পদের মালিক জনগণ- তোমরা তা বিশ্বাস কর। এ লক্ষ্যে পৌঁছবার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। আস্তে আস্তে যেতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর এ কথার প্রয়োজনীয়তা ২০২০ সাল অর্থাৎ মুজিব শতবর্ষে আরও বেশি প্রযোজ্য- বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে আমাদের সবাইকে সোনার মানুষ হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। আমি আরও মনে করি, মুজিব শতবর্ষ হল- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মুজিব আদর্শ বাস্তবায়নের বছর। কারণ দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক, ভাগ্য পরিবর্তনের নির্মাতা, দেশের উন্নয়নের রূপকার, বাংলার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, মাদার অব হিউম্যানিটি, বিশ্বনন্দিত নেতা, দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া ও মুজিব আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব।

সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়ন, এসডিজি অর্জনে আইসিটি ব্যবহারে প্রচারণা, ডিজিটাল ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ও শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখা, বিশ্ব মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে অনন্য অবদানের জন্য গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, আইসিটি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড, এজেন্ট অব চেঞ্জ পুরস্কার ও প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন, জাতিসংঘের সাউথ সাউথ কো-অপারেশন ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ সাউথ পুরস্কার, সম্প্রতি ভ্যাকসিন হিরো, চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ পুরস্কার, অতিসম্প্রতি মর্যাদাপূর্ণ এশিয়ান টাউনস্কেপ জুরিস অ্যাওয়ার্ডসহ ৩৯টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার/অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। ফোবর্সের প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকায় স্থান করে নেন।

বাংলাদেশের গরিব-দুঃখীসহ সব মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা-ভরসার স্থল, বাংলাদেশকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা হিসেবে হাজারও বাধা অতিক্রম করে, ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে তার দূরদৃষ্টি ও বিচক্ষণতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাই দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই মুজিব আদর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আমদের চিন্তা-চেতনায়, জীবন ও কর্মে পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়নের শপথ নিতে হবে। এভাবেই সফল করা সম্ভব মুজিব শতবর্ষ ২০২০।

পরিশেষে এ কথা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করতে চাই, জাতির পিতার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। অর্থাৎ সমগ্র বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পেত না। জাতির পিতা আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথে মাথা উঁচু করে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে হয়, অধিকার আদায় করে নিতে হয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। আমাদের চলার পথ কখনই মসৃণ নয়।

মুজিব জন্মশতবর্ষে আমাদের শপথ হোক- বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সংবিধানের এ চার মূলনীতিকে সত্যিকার অর্থেই প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য সমগ্র দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হল জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাই এ কথা বলতে কোনো কুণ্ঠা নেই যে, শেখ হাসিনা বাঁচলে বংলাদেশ বাঁচবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই যেমন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যথার্থ বাস্তবায়ন হতে পারে; তেমনি জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকীও সফল হতে পারে।

সবশেষে সবাইকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে শুধু বাংলাদেশেই নয়; ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিকভাবে ‘মুজিব জন্মশতবার্ষিকী’ উদযাপিত হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ গৃহীত সব কর্মসূচিতে আপনাদের অংশগ্রহণ এবং কর্মসূচিগুলো সফল করতে সবার সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।

উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

Related posts