মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১ | ১ আষাঢ় ১৪২৮

Select your Top Menu from wp menus

মুক্তিযুদ্ধ: মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি

শেখ রোকন
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর এপ্রিলের ৪ তারিখ পর্যন্ত ১০ দিন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতা ঘোষণার পর একদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে, অন্যদিকে তার প্রথম সারির সহযোদ্ধারা নেতার নির্দেশেই আত্মগোপনে গিয়ে গোপনপথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে হাজির হন। এই ১০ দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ দেশটির সরকারের শীর্ষ মহলের অবস্থান কী? সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ভারত সহযোগিতা করবে কিনা? করলেও তা কীভাবে, কার মাধ্যমে? বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎ হবে কীভাবে?
অনেক আশা-নিরাশা পেরিয়ে এপ্রিলের ৩ তারিখ রাতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম বৈঠক হয় তাজউদ্দীন আহমদের। ওই বৈঠকই মোড় ঘুরিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সক্রিয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে করে তোলে অবশ্যম্ভবী। কোনো কোনো লেখক ও গবেষক মনে করেন, ওই বৈঠক ছিল অনানুষ্ঠানিক। দুই নেতার মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় পর দিন ৪ এপ্রিল।
মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়ে ভারতের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বাংলাদেশের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী ও আমলা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান এবং তরুণ আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক মিত্র, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি এন হাকসার, দিল্লি স্কুল অব ইকনোমিকসের তৎকালীন অধ্যাপক পরবর্তীকালে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।
তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা থেকে ২৭ মার্চ রওনা দিয়ে চুয়াডাঙ্গা হয়ে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ ও পরে দিল্লি পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা স্বাধীনতার পর বর্ণনা করেন আজিজ বাগমারের কাছে। সেই শ্রুতিলিখন ২০১৪ সালে ‘তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়। সেখানে স্বয়ং তাজউদ্দীন আহমদের জবানিতে রয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের প্রেক্ষাপট- ‘১ এপ্রিল রাত ২টায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হলাম। ২ এপ্রিল দিল্লিতে অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান, এমআর সিদ্দিকী, সিরাজুল হক প্রমুখের দেখা পেলাম। ৩ এপ্রিল রাত ১০টায় সফদর জং রোডের বাড়িতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমার দেখা হয়। এই আলোচনার আগেই সমস্ত পরিস্থিতি বিচার-বিশ্নেষণ করে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমাদের সরকার গঠন করতে হবে।’
অপরদিকে আগরতলা হয়ে ৩১ মার্চ দিল্লিতে পৌঁছান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি লিখেছেন- ‘আমার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পরিচয় থাকার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু তার উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত অশোক মিত্র ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার মাধ্যমেই আমি ইন্দিরা গান্ধীর মুখ্য সচিব পিএন হাকসারের সঙ্গে কথা বলি। তাকে সে সময়ে বলা হতো ইন্দিরা গান্ধীর পর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এ প্রসঙ্গে বলি, দিল্লিতে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দু-তিন দিনের কর্মকা আমি পরিচালনা করতে বিশেষভাবে সহায়তা পেয়েছি ছাত্রজীবনের বন্ধু, পরবর্তীকালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের কাছ থেকে। তিনি সে সময়ে দিল্লিতে শিক্ষকতা করতেন এবং অশোক মিত্রসহ অনেকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আমাদের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে অমর্ত্য সেন প্রথমে তার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে যাই অশোক মিত্র ও অন্যদের কাছে। অশোক মিত্র আমাকে পিএন হাকসারের কাছে নিয়ে যান।’ (অসহযোগ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সহযোগ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে/ সমকাল, ২৬ মার্চ, ২০১৭)।
পূর্ববঙ্গের সন্তান ও দেশ বিভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী এবং পরবর্তী জীবনে ভারতের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রের আত্মজৈবনিক ‘আপিলা চাপিলা’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ওই কয়েক দিনের ঘটনাবলি। রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমানের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের কথা তিনি লিখেছেন এভাবে- ‘আনিস ও রেহমান কোনওক্রমে ঢাকা থেকে পালিয়ে কুমিল্লা জেলার সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা পৌঁছয়, পথে অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, তাদের খেঁড়াখোড়া মলিন জামাকাপড়, রেহমানের চশমার বাঁদিকের কাচ আড়আড়ি ফাটা, কোথায় দেওয়াল টপকাতে গিয়ে নাকি আঘাত পেয়েছিল। আগরতলায় ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীদের সৌজন্যে তাঁরা কলকাতায় বিমান পাল্টে সোজা দিল্লী পৌঁছেছে পয়লা এপ্রিল গভীর রাতে।… যেদিন ওরা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিল, সন্ধ্যাবেলা রেহমান ও আনিসকে রেসকোর্স রোডে হাকসারের বাড়িতে নিয়ে গেলাম। এই ইতিহাস বাইরে কারও আদৌ জানা নেই; সেই সন্ধ্যা থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তায় ভারত সরকারের সংগোপন প্রত্যক্ষ ভূমিকার শুরু, আমাদের বন্ধুদ্বয়ের মারফত হাকসারের আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ যার সূচনা।’
মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানো সেই বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের মধ্যে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তা পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধকালে তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা :’৭১’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন- ‘ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন জানান যে, পাকিস্তান আক্রমণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ২৫/২৬শে মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে একটি সরকার গঠন করা হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সহকর্মীরাই (পরে ‘হাইকমান্ড’ নামে যাঁরা পরিচিত হন) মন্ত্রীসভার সদস্য। শেখ মুজিবের গ্রেফতারের খবর ছাড়া অন্যান্য সদস্যদের ভালো-মন্দ সংবাদ তখনও যেহেতু সম্পূর্ণ অজানা, সেজন্য তাজউদ্দীন দিল্লীতে সমবেত দলীয় প্রতিনিধিদের পরামর্শক্রমে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থিত করা যুক্তিযুক্ত মনে করেন।’
কেন তাজউদ্দীন আহমদ সরকার গঠন হওয়ার আগেই সরকার গঠন হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন? মঈদুল হাসান লিখেছেন- ”ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন দিল্লীতে তাঁরই এক ঊর্ধ্বতন পরামর্শদাতা তাজউদ্দীনের সাথে আলোচনাকালে জানতে চান, আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে কোন সরকার গঠন করেছে কিনা। এই জিজ্ঞাসা ও সংশ্নিষ্ট আলোচনা থেকে তাজউদ্দীন বুঝতে পারেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছে কি হয়নি সে সম্পর্কে কোন প্রকৃত সংবাদ ভারত কর্তৃপক্ষের জানা নেই এবং সরকার গঠনের সংবাদে তাদের বিস্মিত বা বিব্রত হওয়ারও কোন আশঙ্কা নেই। বরং সরকার গঠিত হয়েছে জানতে পারলে ‘পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রামে সাহায্য করার’ জন্য ভারতীয় পার্লামেন্ট ৩১শে মার্চ যে প্রস্তাব গ্রহণ করে তা এক নির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপ লাভ করতে পারে বলে তাজউদ্দীনের ধারণা জন্মায়।”
আমরা দেখি, এই বৈঠকের পর ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া শুরু করেন। ফলে একদিকে যেমন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্বিশ্বে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে থাকে; অন্যদিকে, শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ।

Related posts