বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ❙ ১৮ মাঘ ১৪২৯

বায়ু নিরোধক পাটের বস্তা তৈরীতে সুদিনের স্বপ্ন

প্রবীর বিশ্বাস: বায়ু নিরোধক নয় এমন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ পণ্য সংরক্ষণ ও বিপণনে পাটের বস্তা ব্যবহার করেন না। ফলে দেশের পাটকলগুলিতে উৎপাদিত অনেক পণ্য অবিক্রিত থাকে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পাটের বস্তাকে বায়ু নিরোধক করে বাজারজাত শুরু করেছে দেশের সবচেয়ে বড় পাটকল খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলস্ লিঃ। এ জন্য তারা স্থাপন করেছে প্রিমিয়াম লেমিনেটিং প্লান্ট। যেখানকার উৎপাদিত পাটপণ্য ব্যবহার করে বীজসহ বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষণ করে বাজারজাত করছেন ব্যবসায়ীরা।
পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় আঁশ উৎপাদনকারী অর্থকরী ফসল। পাট ও পাটপণ্য শুধু পরিবেশবান্ধব এবং সহজে পচনশীলই নয় এটি পরিবেশে রাখে বিরাট অবদান এবং দেশের কৃষি ও বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা করে। মাটির গুণাগুণ ও জলবায়ুগত কারণে অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান সবচেয়ে ভালো। জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক তন্তু বর্ষ হিসেবে পালিত হওয়ায় এবং উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়কারী কৃত্রিমতন্তুর জনপ্রিয়তা বা ব্যবহার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু আন্দোলনের অংশ হিসেবে পানি, মাটি ও বায়ু দূষণকারী পলিব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র জনমত তৈরি হয়েছে। তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যাগ বিশ্বজুড়ে যখন উদ্বেগের কারণ, তখন পাটের এই ব্যাগ পরিবেশ দূষণ কমাবে সহায়ক হবে।
দীর্ঘ দিন ধরে লোকসানে বাংলাদেশের প্রায় সবকটি পাটকল। তাই লোকসান এড়াতে পাটপণ্যের বহুমুখি ব্যবহার নিশ্চিত করতে বীজসহ অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বস্তা তৈরী করছে খুলনা দি ক্রিসেন্ট জুট মিলস্ কোম্পানী লিমিটেড। মিলের অভ্যন্তরে গত বছরের জুলাই মাসে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় প্রিমিয়াম লেমিনেটিং প্লান্ট বা পিএলপি। এই মেশিনের সাহায্যে চটের বস্তার ভেতরে পরিবেশসম্মত প্লাস্টিকের প্রলেপ দিয়ে বায়ু নিরোধক করা হচ্ছে। ফলে এ জাতীয় চটের বস্তা ব্যবহার করে বীজ, চিনি, লবন, আটা, ময়দার সংরক্ষণ করে বাজারজাত করতে পারছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে পণ্যের গুনগত মান বজায় থাকার পাশাপাশি পাটের বস্তার ব্যবহারও বাড়ছে।
মিলের সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) শাহাবুদ্দিন কাজী বলেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে বস্তা তৈরী হচ্ছে সেই বস্তা কয়েকবার ব্যবহারের পর প্লাস্টিকের প্রলেপ হয়ত নষ্ঠ হয়ে যাবে। তবে বস্তাটি পাটের অন্য বস্তার মতোই বার বার ব্যবহার করা যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবেও সাশ্রয়ী হবে ব্যবহারকারীরা। তিনি আরও জানান, পাটের সাথে কৃষকসহ কোটি কোটি মানুষ সম্পৃক্ত। তাই পাটের ব্যবহার নিশ্চিত হলে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ লাভবান হবে। পাটের সুদিন আনতে হলে পাটের নতুন নতুন পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যপ্তি বাড়াতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।
মিলের উপ-মহাব্যবস্থাপক আরিফুজ্জামান মোল্লা জানান, পাটের বস্তা ব্যবহারের যে ম্যান্ডেটরি এ্যাক্ট ছিল সেটা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। পরিবেশ রক্ষায় সার, চিনি, ধান, চালসহ ১৭টি পণ্য বিক্রয়, বিতরণ ও সরবরাহে বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিত কল্পে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ প্রণীত হয়েছে। এরপর ২০১২ সালে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন পাস করে সরকার। ওই আইনে কিছু বিষয় সুস্পষ্ট না থাকায় ২০১৩ সালে তা সংশোধন করা হয়। তাই এখন প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক গাজী শাহাদাৎ হোসেন বলেন, প্রিমিয়াম লেমিনেটিং প্লান্টে কাজ করেছে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ৫০ জন শ্রমিক। বর্তমানে তারা প্রতিদিন ১০ ও ২০ কেজি ধারণ ক্ষমতার ১০ হাজার বস্তা উৎপাদন করছে। চাহিদার নিরিক্ষে আগামীতে বাড়ানো হবে এই উৎপাদনের পরিমান। পাটজাত বহুমুখি পণ্য উৎপাদনে এজাতীয় পরিকল্পনা একদিকে পাটপণ্যের ব্যবহার যেমন বাড়াবে, অপরদিকে রাষ্ট্রায়াত্ব পাটকলগুলির লোকসান কমিয়ে সুদিন ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। গত ছয় মাসে নতুন এই পণ্য থেকে লাভের মুখ দেখায় আগামীতে পাটের নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

Related posts