মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১ | ১ আষাঢ় ১৪২৮

Select your Top Menu from wp menus

বাংলা বা ‘বেঙ্গল’ তো আমাদের!

ইনাম আহমদ চৌধুরী
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচন সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ হতে চলছে। কয়েক দশকের বামফ্রন্ট শাসন হটিয়ে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেসকে যে কোনো প্রকারে ক্ষমতাচ্যুত করতে যেন বদ্ধপরিকর। তৃণমূল কংগ্রেসও বিনা রণে নাহি দেবে সূচাগ্র মেদিনী। এর ফলে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, দলবদল, বিক্ষোভ, সংঘাত প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে বারংবার উচ্চারিত হচ্ছে ‘বাংলা’ নামটি; এর মধ্য দিয়ে তারা ভৌগোলিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যকে বোঝাচ্ছে। যেমন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সদ্য বিজেপিতে যোগদানকারী, রাজ্য সরকারের সদ্য পদত্যাগী মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন- বাংলাকে বিজেপির হাতে তুলে দেওয়াই তার লক্ষ্য। এর জবাবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ও ভারতের লোকসভা সদস্য এবং বিশেষভাবে উল্লেখ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভাইপো’ অভিষেক ব্যানার্জি বলেছেন- বাংলা কি কোনো বস্তু যে, বিজেপির হাতে তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু দু’জনের কেউই বুঝতে পারছেন না যে, যুযুধান দুই পক্ষ চাইলেও বাংলাকে কারও হাতে তুলে দিতে বা নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। বাংলা তো তাদের নয়, বরং আমাদের, বর্তমান বাংলাদেশের। ‘বাংলা’ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে অভিহিত করাও নেহাত আশার ছলনে ভোলা ছাড়া কিছু নয়।
অতীতে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যকে বাংলা ভাষায় ‘বাংলা’ ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ এবং রাষ্ট্রভাষা হিন্দিতে ‘বাঙ্গালা’ বলে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই পরিবর্তন অনুমোদনের জন্য প্রেরিত হয়। অধুনা অবশ্য শোনা যাচ্ছে যে, কেন্দ্রও প্রস্তাবে সবুজ সংকেত দিয়েছে। যাই হোক না কেন, সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারি এবং বেসরকারিভাবে ক্রমে ক্রমে এই শাব্দিক ব্যবহারবিধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচলিত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গকে শুধু বাংলা বা ‘বেঙ্গল’ বলার বা সে হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার প্রবণতা ও প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হচ্ছে এটা সুপরিকল্পিত। আসন্ন বিধানসভা সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে পশ্চিমবঙ্গের বদলে ‘বাংলা’ ব্যবহার কি তারই প্রতিফলন?
২০১৬ সালেই কোনো কোনো পত্র-পত্রিকায় আমি মতদ্বৈধতা প্রকাশ করে প্রস্তাব করেছিলাম, এককভাবে পশ্চিমবঙ্গের এ জাতীয় পরিবর্তন সূচিত করা সম্ভবত সমীচীন বা সংগত হচ্ছে না। একান্তই যদি তারা ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে তারা শুধু ‘বঙ্গ’ অথবা ‘বঙ্গ-প্রদেশ’ (যেমন মধ্য প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ ইত্যাদি) নাম গ্রহণ করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আলোচনায় অনেক সদস্য শুধু ‘বঙ্গ’ নামকরণে সমর্থন জানিয়ে ছিলেন। অন্যান্য কারণের মধ্যে পরিবর্তন করার একটি কারণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, রাজ্যের নাম ‘ডব্লিউ’-এর পরিবর্তে ‘বি’ দিয়ে শুরু হলে দিল্লিতে ‘অ্যালফাবেটিক প্রায়োরিটি’ বা আক্ষরিক-ক্রমের তুলনামূলক সুবিধা পাওয়া যায়। হয়তোবা কৌতুকছলেই এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তবুও বলা যেতে পারে ‘বঙ্গ’ সে সুবিধা রক্ষা করছে।
এককভাবে পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ বা ‘বেঙ্গল’ নাম গ্রহণ ও ব্যবহার ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনগত দিক থেকে অশুদ্ধ, অসঙ্গত ও অনভিপ্রেত। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবে রাঢ় বা কিছু অংশে গৌড়ীয়-বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। শুরু থেকেই ‘বাঙ্গালা’ বা ‘বাংলা’ বা ‘সুবেহ-বাংলা’ মুখ্যত বর্তমান বাংলা-দেশকেই বুঝিয়েছে। জাতি হিসেবে যে জন্যই আমরা ‘বাঙ্গালী’। আমাদের ভাষা বাংলা। অতীত যুগে খণ্ড খণ্ড হলেও বাংলার স্বাধীন সুলতান বা নৃপতিরা বর্তমান বাংলাদেশ থেকেই ‘বাংলা’ শাসন করেছেন। কলকাতা তো ব্রিটিশ আমলের সৃষ্টি।
এর চেয়ে বড় ঐতিহাসিক সত্য কিছু নেই যে, আমরা বাঙালিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহান নেতৃত্বে চরম ত্যাগ এবং এক অতুলনীয় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা অর্জন করেছি। যে এলাকার স্বাধীনতা আমরা অর্জন করতে পেরেছি, সেটাই তো আজকের বাংলাদেশ। আর আমাদের অবিসংবাদিত নেতার উপাধি ‘বঙ্গবন্ধু’। তিনিই বাঙালি জাতির পিতা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। একাত্তরের ৭ মার্চে তার ‘জয়বাংলা’ স্লোগানের আহ্বানেই তো সূচিত হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম। ‘জয়বাংলা’ই তো ছিল, আছে এবং থাকবে বাঙালির চিরকালের ‘ব্যাটল-ক্রাই-প্রেরণা’ ও উদ্দীপনার উৎস। যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখিয়েছিলেন, দেখেছিলেন- তা তো ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন এবং সে স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্যই তো আজ জাতি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে দৃপ্তপদে ধাবমান। আমাদের জাতীয় সংগীতে রয়েছে এই সোনার বাংলার প্রতি আমাদের গভীর মমত্ববোধ এবং অখণ্ড আনুগত্যের প্রত্যয়ী উচ্চারণ এবং দৃঢ অঙ্গীকার।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশকালে আমাদের একজন জাতীয় নেতার উপাধি ছিল ‘শের-এ-বাংলা’। বাংলার বাঘ এ কে ফজলুল হক। তার নামেই আমাদের পার্লামেন্ট এলাকার নাম ‘শের-এ-বাংলা নগর’। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ‘বাংলা’ প্রতিষ্ঠার মানসেই তো বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার কতিপয় তরুণ বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, যে একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা পৃথিবীতে সসম্মানে স্বীকৃত। বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার গৌরব, বাংলার অর্জন, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার কৃতিত্বের প্রধান দাবিদার তো মুখ্যত বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালি। কোনো ভৌগোলিক সত্তা যদি এককভাবে ‘বাংলা’ বা বেঙ্গল নামে পরিচিতি রাখার অধিকার রাখে, তা তো আমাদের এই বাংলাদেশ। নামের জন্যে দুটো ভৌগোলিক সত্তার মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। যেমন হয়েছে বলকান এলাকায় মেসিডোনিয়ায়। কিন্তু আমরা তো তা আন্তরিকভাবে পরিহার করতে চাই।
এককভাবে পশ্চিমবঙ্গ যদি আইনগতভাবে ‘বাংলা’ এবং ‘বেঙ্গল’ নাম গ্রহণ এবং ব্যবহার করে, তাতে বিভিন্ন সমস্যা ও জটিলতা এবং আইনগত অসুবিধাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক- উভয় ক্ষেত্রে। বাংলা বা ‘বেঙ্গল’ ব্র্যান্ড নাম হিসেবে ব্যবহার ও চালু করে তাদের উৎপাদিত সামগ্রী, পদ্ধতি বা প্রক্রিয়াকে তারা ‘বাংলা’ বা ‘বেঙ্গল’-এর বলে দাবি করতে পারেন বাংলাদেশের এ জাতীয় দাবিকে অগ্রাহ্য করে। ডব্লিউটিও এবং ডব্লিউপিওতে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইটে এই বিপত্তি দেখা যাবে এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি অবস্থার সৃষ্টি অবশ্যই হতে পারে। বাংলা কুইজিন, বাংলা খাবার-দাবার, বাংলা পরিচ্ছদ, মিউজিক অব বেঙ্গল, টেস্ট অব বেঙ্গল প্রভৃতি বলতে তো বর্তমান পশ্চিমবঙ্গেরই বোঝাবে, বাংলাদেশের নয়। পৃথিবীর সর্বত্র যেখানে ‘বেঙ্গল’ বা ‘বাংলা’ নামধারী বাংলাদেশের সব বাণিজ্যিক, শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা রয়েছে, তা পড়বে বিপাকে। এ অবস্থা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ‘বাংলা’ বা বেঙ্গল তো আমাদের অস্তিত্বেরই আরেক নাম।
সম্ভাব্য এই পরিস্থিতি পরিহার করার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা অবিলম্বে গ্রহণ করা কাম্য বলে মনে করি। এই উদ্যোগ সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ফ্রন্টেই জাতীয়ভাবে নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এ নিয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে। সাংবিধানিক কোনো পরিবর্তন বা সংযোজনের প্রয়োজন হলে তাও করতে হবে। প্রচারমাধ্যম, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ- সর্বক্ষেত্রে এ ব্যপারে সচেতন থাকতে হবে। তা দেশেই হোক বা বিদেশে।
কারও প্রতি কোনো বৈরী মনোভাব নিয়ে আমাদের এই প্রচেষ্টা হবে না। সম্ভাব্য একটি অনভিপ্রেত অস্বস্তিমূলক অবস্থার যাতে সৃষ্টি না হয়, তারই জন্য হবে আমাদের এই উদ্যোগ। এটাকে আমরা সহযোগিতামূলকভাবেই গড়ে তুলতে চাই; প্রতিযোগিতামূলক নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং এর অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবাংলা, উভয়ের সঙ্গেই আমাদের সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে সৌভ্রাতৃত্বমূলক সুসম্পর্ক রয়েছে। আমাদের স্থির বিশ্বাস, এই অত্যন্ত চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে এ নিয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হবে না। বরং পারস্পরিক স্বার্থের সম্যক উপলব্ধি সম্পর্ক ও সম্প্রীতিকে ঘনিষ্ঠতর করে তুলবে।

সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ; অবসরপ্রাপ্ত সচিব

Related posts