সোমবার, ৮ মার্চ ২০২১ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭

Select your Top Menu from wp menus

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে মোংলা বন্দরের উদ্যোগ

বাগেরহাট প্রতিনিধি: সু-দীর্ঘকাল থেকেই মানুষের জীবন যাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ওপর সমুদ্রের প্রভাব রয়েছে। পণ্য পরিবহন, স্থানান্তর,মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণসহ নানা কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে সমুদ্রের গুরুত্ব অনেক।
তবে সামুদ্রিক শিল্পের অধিক বিকাশে পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য হুমকি রয়েছে। এ শিল্পের সব থেকে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে জাহাজের বর্জ্যে সমুদ্র দূষণ। তবে এ দূষণ রোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে মারপোল কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। এ কনভেনশনে সমুদ্র বন্দর গুলির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জনকে অত্যন্ত জরুরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
১৯৭৭ সালের মেরিন পলিউশন অর্ডিন্যান্সেও জাহাজের বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণের জন্য অয়েল স্পিল্ড কন্টিনজেন্সি প্লান প্রণয়নের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। মারপোল কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ ও মেরিন পলিউশন অর্ডিন্যান্স হিসেবে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সমুদ্র বন্দরে জাহাজের বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। কিন্তু মোংলা বন্দরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলায় এ ব্যবস্থা ছিল না। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে মোংলা বন্দরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। “মোংলা বন্দরে আধিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বন্দরের বর্জ্য সংগ্রহকারী ও তেল অপসারণকারী জলযান, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইকুইপমেন্টসহ অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
মোংলা বন্দর সূত্রে জানা যায়, “মোংলা বন্দরে অধিক বর্জ্য ও নিঃসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় একটি বর্জ্য সংগ্রহকারী জলযান, দু’টি তেল অপসারণকারী জলযান, ওয়েল স্কিমার, বুম ও সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি কেনা হবে। এ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় মুরিং গিয়ারসহ পল্টুন ও ডাম্পবার্জসহ বেশকিছু অবকাঠামোও নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে চলাচলকারী বিভিন্ন বাল্ক,কন্টেইনার, ট্যাংকার ও অন্যান্য জলযান থেকে নিঃসৃত তেল ও পেট্রোলিয়াম জাতীয় স্লাজ,ব্লিজ, বর্জ্য, বালাস্ট, পানি ও অন্যান্য আবর্জনা সংগ্রহ করা হবে। এসব বর্জ্য বাছাই করে যেমন বিক্রি করা যাবে, তেমনি সলিড ও অ-রুপান্তরযোগ্য সলিড বর্জ্যগুলো সহজে গার্বেজ করা যাবে। পশুর চ্যানেল ও মোংলা বন্দরের আশপাশের নদ-নদীতে নিঃসৃত তেল অপসারণ সহজ হবে। এর ফলে মোংলা বন্দর এলাকায় সামুদ্রিক দূষণ যেমন কমবে, ঝুঁকি ও দূষণের হাত থেকে বেঁচে যাবে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। এছাড়া বন্দর ও চ্যানেল এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প- এমনটি দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে দীর্ঘদিন পরে হলেও মোংলা বন্দরের বর্জ্য ও তেল অপসারণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা।
সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে আসা জাহাজের তেল ও বর্জ্যে সমুদ্রে দূষণ হচ্ছিল। এতে সমুদ্রের জলজ প্রাণীর পাশাপাশি সুন্দরবনের গাছ ও প্রাণীরা হুমকিতে পড়েছে। দীর্ঘদিন পরে হলেও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ নিঃসৃত তেল অপসারণের জন্য যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। আমরা চাই, দ্রুত এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক।
খুলনা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ফিসারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিলিনের অধ্যাপক ড. এমডি নাজমুল আহসান বলেন, জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে মোংলা বন্দরের গুরুত্ব রয়েছে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু এ গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত দিকও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। সেই দিক বিবেচনা করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল অপসারণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, এটা খুবই ইতিবাচক। একটি বন্দরের আন্তর্জাতিক সুনাম ও রেটিং বৃদ্ধির জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জাহাজের নিঃসৃত তেল অপসারণের আধুনিক ব্যবস্থা থাকা খুবই জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, বন্দর কর্তৃপক্ষের এ প্রকল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বন্দরের সুনাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায়ও ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সামুদ্রিক জলজ প্রাণী ও জলজ সম্পদ দূষণ থেকে বাঁচবে। পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, বন্দরে আগত জাহাজ থেকে নিঃসৃত তেল ও বর্জ্যের অপসারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় আমরা বন্দর ও বন্দর সংলগ্ন এলাকা দূষণমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করি, ২০২২ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন হবে।

Related posts