মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০ | ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

Select your Top Menu from wp menus

নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রার মানুষ চায় টেকসই বেড়িবাঁধ

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি: উপকূলীয় মানুষের জীবন-যাপনের মূল সমস্যাই হচ্ছে নদী ভাঙ্গন। নদীতে কোন কারনে পানি বাড়লে বা বন্যা হলে নদী হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর। নদী ভাঙ্গন মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ে ফেলে দেয়। নদী-ভাঙ্গন মানেই কয়রা উপজেলার মানুষের তিলতিল করে গড়ে ওঠা সহায় সম্বল তছনছ হয়ে যাওয়া। চোখের পলকেই সব নদী গর্ভে চলে যাওয়া। উঠানের চুলো থেকে শুরু করে বাড়ির ঘটি-বাটি কিছুই থাকে না। অনেকে তড়িঘড়ি কিছু রক্ষা করতে পারলেও বেশির ভাগই তা পারে না। মুহর্তেই হয়ে যায় সহায় সম্বলহীন।

কয়রা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের সুপার সাইক্লোন ঘূর্নিঝড় আম্পানে নদী ভাংঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ১৩ হাজার ঘরবাড়ি। কয়রায় কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ১৩ টি পয়েন্টে নদী ভাংঙ্গনে উপজেলার ৩০টি গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী ৪টি ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্লাবিত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদী পশুর খাদ্য নিয়ে সঙ্কটে পড়েছেন পানিবন্দী মানুষ। নদী ভাঙ্গনে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়রা উপজেলার কয়রা, মহারাজপুর , উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ আছে, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ।পানিতে তলিয়ে আছে উপজেলা সদর রাস্তা ঘাট ও গোটা উপজেলা চত্বর। গ্রামের অনেক বাসিন্দারা ঘরের মধ্যে বাঁশের উচু মাঁচা তৈরি করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকে গবাদী পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। গ্রামগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির চরম সঙ্কটে পড়েছে গ্রামবাসী।

বর্তমানে ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করায়, নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আশ্রায়কেন্দ্রে জায়গা না পেয়ে কেহ আত্মীয়স্বজন কেউবা রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন।

কয়রা উপজেলার, মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া, লোকা, সদর ইউনিয়নের গোবরা হরিণ খোলা, গোবরা ঘাটাখালি, ২ নং কয়রা খালের গোড়া ৩ কিলোমিটার ওয়াবদার রাস্তা সম্পূর্ণ বিলিন হয়েছে, উত্তর বেদকাশি গাজি পাড়া, রত্না ঘেরি, কাশিরহাটখোলা, দক্ষিণ বেদকাশির গোলাখালি, আংটিহারা, ছোট আংটিহারা বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে গোটা এলাকা প্লাবিত হয়ে পানির নিচে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার বিঘা মৎস্যঘের ও ফসলি জমি।

কয়রায় নদী ভাঙ্গন নতুন নয়। প্রতি বছর কম বেশি কয়রায় নদী ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। কিন্তু নদীভাঙন প্রতিরোধের জন্য আজও কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সরকারি-বেসরকারি ভাবে যে সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া হয় তা অতি সামান্য। একটা পরিবার সাহায্যের অর্থ দিয়ে বড়জোড় ২/৪ দিন চলতে পারে।নদীভাঙ্গনে নি:স্ব হওয়া আবুল কালাম বলেন, এই সামান্য সাহায্য দিয়ে কি হবে। প্রতি বছরই নদী ভাঙ্গনে ভিটে হারা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। গেল বছর আমার বড় ভাই নি:স্ব হলো এবছর হলাম আমি। জানিনা আগামী বছর আবার কোন ভাই আমার মত নি:স্ব হয়ে যায়। আমরা সাহায্য চাই না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবী নদী ভাঙ্গন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান করুন।

কয়রায় কপোতাক্ষের ভাঙ্গনে ভিটে মাটি হারানো সালমা খাতুন বলেন, আমাদের দু:খের শেষ নেই। আমরা চাইনা নতুন করে আর কেউ এই দু:খের সঙ্গী হোক। তাই সরকারের কাছে দাবী নদী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হউক।

সচেতন মহলের অভিমত নদীভাঙ্গন প্রতিরোধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা এযাবতকাল গ্রহণ করা হয়নি। নদী ভাঙন রোধে কিছু শহর আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকেই কেবলই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আর এই কাজটি করে থাকে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কোথাও কোথাও প্রকল্প গ্রহণ করা হলেই সেখানে আবার পুকুর চুরির ঘটনা ঘটে। এই চুরি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। অথচ একটি জনবসতিকে কীভাবে রক্ষা করা যেতে পারে সেই উদ্যোগ নেই বললেই চলে। আর এ কারণেই প্রতিবছর নিঃস্ব-হতে হয় হাজার হাজার মানুষকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ভাঙন রোধের প্রধান উপায় হল টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা। এছাড়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও খাল গুলো খনন করা। দেশের নদীগুলো ড্রেজিং করা ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান না করা গেলে আগামীতে ছোট খাটো বন্যাও আমাদের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

আগামী কয়েক বছরে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মান না করা হলে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে উপকূলী অঞ্চল কয়রা।

খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সাংসদ মো. আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উপকূলীয় এলাকার বাঁধ রক্ষায় গৃহীত মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কয়রার মানুষের কষ্ট স্থায়ীভাবে লাঘব হবে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জরুরিভিত্তিতে মেরামতের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

Related posts