বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ❙ ১৯ মাঘ ১৪২৯

তাঁর জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে

আনিসুজ্জামান

জীবনে আয়ু পেয়েছিলেন মাত্র পঞ্চান্ন বছর। তার মধ্যেই খালি হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র- বাংলাদেশ। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও সময় পাননি বেশি। দেশদ্রোহী চক্রের আকস্মিক আঘাতে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে প্রায় একই সঙ্গে। বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে ছিল নেতার রক্তাক্ত ও প্রাণহীন দেহ- হন্তারা অনুগ্রহ করে তাঁকে যেমনতেমন করে সমাধিস্থ করবে, তার অপেক্ষায়। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগে পৃথিবীর বিশিষ্ট রাষ্ট্রনায়করা তাঁকে স্মরণ করেছে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায়।

দেশের মানুষের কথা ভিন্ন। তাঁর চেয়ে অভিজ্ঞ ও বয়স্ক রাষ্ট্রনেতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁকেই মেনেছে অবিসংবাদিত নেতা বলে। যে-নেতা পাকিস্তানের ২৩ বছরের অর্ধেক সময়ে কারাগারে কাটিয়েছেন পূর্ব বাংলার- বাংলাদেশের- বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলে, তার ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্যে সংগ্রাম করে। যে-নেতা চেয়েছেন আমরাই নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করব, অন্যের কথা মান্য করব না। তিনি কখনো কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আশঙ্কায় থেকেছেন, পেছন থেকে গুলি করে সেনানিবাসের অভ্যন্তরেই তাঁর জীবনাবসানের আশঙ্কাও ছিল। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র বিফল করে তিনি তাঁর জনগণের কাছে ফিরে এসেছেন বিজয়ী বীরের বেশে। তবু শেষরক্ষা হয়নি।

শেখ মুজিবের ছিল প্রবল আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। যখন কারাগারের বাইরে ছিলেন, তখন ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি। যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, তাদের নামধাম মনে রাখতে পারতেন। এরাই তাঁর দলের কর্মী, দলের স্থানীয় নেতা, তাঁর সংগঠনের মেরুদণ্ড। এরা কখনো তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি- তাঁর সংগ্রাম এদেরই মুখে অন্ন জোগাতে, এদেরই জন্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আশ্রয় নিশ্চিত করতে। এদের তিনি ভালোবাসতেন, বোধহয় বেশি ভালোবাসতেন। এরাই তাঁর পদাতিক সেনা। যখন এইসব নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপরে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী সশস্ত্র আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন এরাই হাতের কাছে যা পেয়েছে তা নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করেছে। এই অসম শক্তির দ্বন্দ্বে এরাই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেছে।

বঙ্গবন্ধু যখন ক্ষমতার বাইরে, প্রয়োজনে যখন অসহযোগ আন্দোলন ডেকেছেন, তখন এই সরল জনতা সে-আন্দোলনকে সফল করেছে। সারা পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছে, সেনানিবাস ছাড়া সবকিছু চলছে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলিনির্দেশে। নেতা যখন তাদের বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, তখন সেই মুক্তি ও স্বাধীনতার মানুষ সমর্পিত হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের এই সাধারণ মানুষ নিজেদের শ্রম দিয়ে উন্নয়নের চাকা সচল রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাকশিল্পের মহিলা শ্রমজীবীরা, ক্ষেতের কৃষক- এদের শ্রমের কারণেই বাংলাদেশ উন্নয়নের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন- তারা নিজের কর্তব্য পালন করবে। আমাদের যত ঋণ সব এদের কাছে।

আর এক বছর পর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুবর্ণজয়ন্তী। আমরা আজ এক শতবর্ষ পালন করছি, এক বছর পর সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। বীরের মতো, বিজয়ীর মতো। ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ সেদিন সার্থক হবে। তাঁর জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।

আনিসুজ্জামান, জাতীয় অধ্যাপক, বিশিষ্ট লেখক

Related posts