সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

গুলতিম্যান থেকে দেশসেরা তিরন্দাজ রোমান

মোহাম্মদ জুবায়ের :

শৈশবে হাতে ছিল গুলতি। কৈশোরে বাঁশের তৈরি তির-ধনুক। রোমান সানার গল্পটা যেন রূপকথার মতো শোনায়। স্রেফ শখের বশে আর্চারিতে পা রেখে এখন তিনি দেশসেরা তিরন্দাজ। ঘরে-বাইরে জিতেছেন সোনার পদক। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই ছোট্টবেলা থেকে শুরু করে ‘সেলিব্রেটি’ হয়ে ওঠার গল্প শোনালেন রোমান।

কদিন আগে ফিলিপিন্সের ক্লার্ক সিটিতে হওয়া এশিয়া কাপ-ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং টুর্নামেন্টে (স্টেজ-৩) রিকার্ভ পুরুষ এককে চীনের প্রতিযোগীকে ৭-৩ সেট পয়েন্টে হারিয়ে সোনা জেতেন রোমান। পরে দলগত ও মিশ্র দলগততেও পান পদক। এই প্রথম নয়, ২০০৮ সালে শখের বশে যে পথ চলা শুরু, তার বাঁকে বাঁকে অনেক পদকে চুমো এঁকেছেন তিনি।

গুলতি হাতে দুরন্ত শৈশব

৮ জুন, ১৯৯৫ সাল। খুলনা জেলার কয়রা গ্রামে জন্ম। গ্রামের আলো বাতাসে আর দশটা শিশুর যেমন দস্যিপনা নিয়ে বেড়ে ওঠা, রোমানেরও তাই। ভালোবাসতেন ফুটবল। তবে বেশি ভালোবাসার বস্তু ছিল গুলতি!

“কয়রাতে আমি ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। খুব দুরন্ত ছিলাম। গুলতি দিয়ে এদিক-ওদিক পাখি মেরে বেড়াতাম দলবল নিয়ে। ফুটবল খেলতাম। গ্রামের আরও অনেক খেলার প্রতি আগ্রহ ছিল। সত্যি বলতে পড়াশোনায় তেমন একটা মন বসত না। সারাক্ষণ খেলা নিয়েই থাকতাম। হাহাহা।”

“এরপর আমরা চলে এলাম খুলনা শহরে। রূপসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। গ্রাম থেকে শহরের জীবন…বোঝেন তো কেমন হয়। এরপর দুই দফা স্কুল বদল হলো। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আর্চারিতে এলাম হাসান স্যারের কথায়। এরপর অনেক চড়াই-উৎরাই এসেছে কিন্তু আর্চারি নিয়েই আছি।”

শখ থেকে শুরু

আব্দুল গফুর সানা-বিউটি বেগমের ঘর আলো করে আসা তিন ভাই-বোনের মধ্যে রোমান সবচেয়ে ছোট। পরিবারের ছোটজন বলে স্বাধীনতা মিলেছে বাকিদের চেয়ে বেশি। সারাদিন খেলায় মেতে থাকা ছেলেটি একদিন হঠাৎ করেই এলো খুলনায় হওয়া আর্চারি ফেডারেশনের অধীনে আর্চার বাছাইয়ের প্রতিযোগিতায়। তির-ধনুকের প্রেমে পড়ে যাওয়ার সেই শুরু। শুরু হলো বন্ধুর পথে চলাও।

“হাসান স্যার বললেন, এত খেলা খেলিস, চল আর্চারির বাছাই হচ্ছে, সেখানে যায়। শুরুতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। স্যার নিজে আমাদের ৪/৫ জনের ফরম পূরণ করে দিলেন। হাতে ধরে-ধরে শেখালেন কিছুটা। এক সপ্তাহ ট্রেনিং করলাম। এরপর তির মেরে দেখি জায়গায় লাগছে। বেশ ইন্টারেস্টিং! বাছাইয়ে টিকে গেলাম।”

“আর্চারি নিয়ে মজে গেলাম। এসএসসির রেজাল্ট খারাপ হলো। বাবা-মা ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে সুন্দরবন আদর্শ কলেজে ভর্তি হলাম। ফের যোগাযোগ শুরু করলাম আর্চারির কর্মকর্তাদের সঙ্গে।”

“২০১২ সালে ধাক্কা খেলাম আবারও। মোটরসাইকেল অ্যাকসিডেন্টে পা ভাঙল। মনে হচ্ছিল স্বপ্নটাই ভেঙে গেলো। ৮ মাস পুর্নবাসনে থাকার পর বাংলাদেশ আনসার সুযোগ দিল। শুরুতে ঠিক মতো দাঁড়াতে পারতাম না। হাঁটতে পারতাম না। কিন্তু হাল ছাড়িনি।”

দেশসেরা হয়ে ওঠা

২০১৩ সালের বাংলাদেশ গেমসে রিকার্ভ একক ও দলগততে সোনা জয়ের পর সাফল্য ধরা দিতে থাকল নিয়মিত। পরের বছর থাইল্যান্ডে এশিয়ান গ্রাঁ প্রিঁতে জিতলেন সোনা। দেশে ও দেশের বাইরে এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও দলীয় মিলিয়ে ১৭টি সোনার পদক জিতেছেন রোমান।

গত জুনে নেদারল্যান্ডসে হওয়া বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপসে ইতালির মাউরো নেসপোলিকে ৭-১ সেট পয়েন্টে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকের টিকেট এনে দেন রোমান। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানালেন স্নায়ুচাপে ভেঙে পড়া দিনগুলি পেছনে ফেলে আসার কথা।

“আগে এক ধরণের নার্ভাসনেস কাজ করত। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আর্চারদের বিপক্ষে খেলতে গেলে মনে মনে দুর্বল থাকতাম। এখন আর তা হয় না; আত্মবিশ্বাস কাজ করে, যদি নিজের সেরাটা দিতে পারি, তাহলে আমিও পারব। শুরুটা ভালো না হলেও ভেঙে পড়ি না।”

“বিশ্বমানের আর্চারদের সঙ্গে তুলনা করলে আমি নিজেকে ১০-এর মধ্যে ৯ দিব। কারণ ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিংয়ে আমি এখন ১০ নম্বরে।”

“(হাসি দিয়ে বললেন) আমি এখন সেলিব্রেটি! বিমানবন্দরে এত ক্যামেরা, এত মানুষ দেখে তো আমি শুরুতে একটু লজ্জা পেয়েছিলাম। আসলে মানুষ যদি চেষ্টা করে সৃষ্টিকর্তাও তার প্রতিদান দেন।”

এসএ গেমস ও অলিম্পিক নিয়ে স্বপ্ন

এসএ গেমসের (দক্ষিণ এশিয়ান গেমস) পরের আসর এ বছরের শেষ দিকে নেপালে হওয়ার কথা। এ  আসরে বাংলাদেশ আজও সোনার পদকের স্পর্শ পায়নি। ২০২০ সালে জাপানের টোকিওতে বসবে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত অলিম্পিক। রোমানের নিশানায় আপাতত এই দুই আসর।

“মার্টিন ফ্রেডরিখ (আর্চারির জার্মান কোচ) আসার পর আমাদের সবকিছু খুব বেশি বদলেছে। মার্টিনের পরিকল্পনা অসাধারণ। সে খেলোয়াড়দের খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে। ফেডারেশন থেকেও সব রকমের সহযোগিতা পাচ্ছি। তো আমাদেরও দায়বদ্ধতা আছে দেশের প্রত্যাশা মেটানোর।”

“এসএ গেমসে আজও আমরা স্বর্ণপদক পাইনি। এটা জেতা আপাতত মূল লক্ষ্য। তাছাড়া সবার লক্ষ্য থাকে অলিম্পিকে পদক জেতা। আমারও আছে। আসলে হয় কি, আর্চারি এমন একটা খেলা, সেখানে নিজের সেরাটা দিতে পারলে, ভাগ্য একটু পাশে পেলে মিলে যায় অনেক কিছু।”

নতুন সে স্বপ্ন ছোঁয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন রোমান সানা। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামই হয়ে উঠেছে তাদের ঘরবাড়ি-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় এখানেই সারাবছর চলে নিবিড় প্রশিক্ষণ। – বিডিনিউজের সৌজন্যে

Related posts