মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১ | ১ আষাঢ় ১৪২৮

Select your Top Menu from wp menus

এখন দেশেই হচ্ছে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা

বিশেষ প্রতিনিধি: ঊনচল্লিশ বছর বয়সী নাজমা খাতুন ব্রেস্ট পরীক্ষা বা ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করার জন্য চিকিৎসকের কাছে যান। চিকিৎসক হাত দিয়ে তার ব্রেস্ট পরীক্ষা করার পর সন্দেহ হলে নাজমাকে কিছু টেস্ট করতে বলেন। টেস্টের রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক নিশ্চিত হন তার ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে। নাজমা কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে মহাখালীস্থ ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে যান এবং সেখানে চিকিৎসা নেন। বিদেশে চিকিৎসা করার সামর্থ্য তার ছিল, তথাপি তিনি দেশে চিকিৎসা নিতে চান এজন্য যে, তিনি শুনেছেন এখানে কম খরচে ভালো চিকিৎসা হচ্ছে এবং অনেকেই ভালো হচ্ছেন। তাই ভয় না পেয়ে তিনি সাহসের সাথে এ রোগ মোকাবেলা করছেন।
নাজমা বলেন, বাইরে গেলে চিকিৎসা ছাড়া ভিসা, প্নেন ভাড়া, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি খরচ যেমন বেশি, তেমনি এসব ম্যানেজ করাও কঠিন। সঙ্গে দুই/একজন সঙ্গীও প্রয়োজন। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করার সময় পরিবার বা নিজস্ব কাজকর্মের বিষয়ে অনেক সময় অবসাদে পেয়ে বসতে পারে। অনেক সময় মন ভালো থাকে না। এখানে পরিবার ও কাছের লোকজন থাকে। সহানুভূতি-সেবা পাওয়া যায়। হয়রানি কম হয়। এ সময় ভালো খাবারের প্রয়োজন। সেটাও সহজে যোগাড় করা যায়। পরিবারের সাথে থাকায় বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যায়। দুশ্চিন্তা কম হয়। এ জন্য আমি এখানে চিকিৎসা নিতে চাই এবং দেশের চিকিৎসকদের প্রতি আমার আস্থা আছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ‘উন্নত দেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা ভালো হয়, এতে সন্দেহ নেই। তবে, এখানেও ব্রেস্ট ক্যান্সারসহ বেশ কিছু ক্যান্সারের চিকিৎসায় অনেকেই পুরোপুরি ভালো হচ্ছেন। বাইরে চিকিৎসার আয়োজন করতে দুই/তিন মাস লেগে যায়। ততদিনে সমস্যা বাড়ে। সাধারণত যারা এ রোগে আক্রান্ত হন তাদের উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ থাকে। কেমো বা রেডিওথেরাপি দেয়ার সময় এসব রোগও বেড়ে যায়। তখন সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন হয়। এতো সমস্যায় রোগী অনেক অসহায় হয়ে পড়ে। মনের জোর হারিয়ে ফেলে। আবার দীর্ঘদিন বাইরে চিকিৎসা নিয়ে সার্জারি করার পর সেটা না শুকাতেই অনেকে দেশে ফেরেন। এতে ইনফেকশন হয়। অনেকে বাইরে থেকে কেমোর ওষুধ নিয়ে আসেন। কিন্তু কেমোর ওষুধ ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে তার গুণগত মান নষ্ট হয়। এ সব কারে আজকাল অনেকেই দেশে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা এখানে চিকিৎসা খরচ অনেক কম।’
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্স অব হসপিটাল (এনআইসিআরএইচ)-এর মেডিকেল অনকোলজির সাবেক অধ্যাপক ডা. পারভীন শাহিদা আখতার বলেন, ‘ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে যে কোনো ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা রয়েছে। এ হাসপাতালে খরচ খুবই কম। সরকার পর্যাপ্ত ওষুধপত্র কেনেন। এখানে কেমো থেরাপির ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হয়। বেডের ভাড়া কম এবং অন্যান্য পরীক্ষাগুলো নামমাত্র মূল্যে করানো হয়। তিনি আরো বলেন, ২০ বছর বয়স থেকে নিয়ম মাফিক ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করালে এ ক্যান্সার জটিল আকার ধারণ করবে না। তবে ৪০-৫০ বছর বয়স্ক নারীরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। কাজেই এ সময়টা অবশ্যই ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করিয়ে নেয়া উচিত।
ন্যাশনাল সেন্টার ফর সার্ভিক্যাল এন্ড ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং সেন্টার-এর প্রকল্প পরিচালক ডা. আশরাফুন নেসা বলেন, আমরা এখানে বিনামূল্যে ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করে থাকি। প্রতিদিন এ সেন্টারে প্রায় ১ শত জনের ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করা হয়। বাড়িতে নিজে কীভাবে এ পরীক্ষা করবেন সেটাও শিখিয়ে দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের ৪৬৪টি সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ২৭১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কপ্লেক্সে এবং বাকিগুলো জেলা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল এবং মাতৃসদনে রয়েছে। এসব হাসপাতালে একইভাবে বিনামূল্যে ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করা হয়। ২০০৫ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত আমরা ২২ লাখ ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করেছি। এর মধ্যে ৩৫ হাজাররের মতো পজিটিভ পেয়েছি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন তানি বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন ৬০-৭০ জনের ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করা হয়। কেউ পজেটিভ হলে তাকে সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়। সরকার নির্ধারিত স্বল্প মূল্যে পরীক্ষাগুলো করা হয়। রেডিও থেরাপি ও কেমো থেরাপিও খুবই কম মূল্যে দেয়া হয়। অপারেশন বিনা মূল্যে করা হয়। এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই সুস্থ্য হয়েছেন এবং ভালো আছেন। সারা দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে একইভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সারের স্ক্রিনিং এবং কম মূল্যে চিকিৎসা রয়েছে।’
ইংল্যান্ডের সরকারি হাসপাতালে ‘স্পেশালিস্ট কনসালটেন্ড অব ব্রেস্ট ক্যান্সার’ পদে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. তাসমিয়া তাহমিদ প্রত্যেক মাসে লালমাটিয়ায় ঢাকা নবজাতক শিশু হাসপাতালস্থ ‘তাসমিয়া তাহমিদ ব্রেস্ট ক্যান্সার সেন্টার’-এ প্রত্যেক মাসে ৭ দিন রোগি দেখেন। তিনি বলেন, ‘এটা নির্মূলযোগ্য রোগ। শুরুতে ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা হলে শতভাগই ভালো হয়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইংল্যান্ডের মতো মান সম্পন্ন ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা এখানে হয়। কম মূল্যে চিকিৎসা করছি। চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৭-৮ মাসে ৫-৬ লাখ টাকা খরচ হয়। ইংল্যান্ড বা অন্য কোনো উন্নত দেশে এ মানের চিকিৎসা (অন্যান্য খরচ ছাড়া শুধুমাত্র চিকিৎসা যেমন- সার্জারি, থেরাপি ও অন্যান্য পরীক্ষা ) পেতে দশগুণ খরচ হয়। অর্থনৈতিকভাবে যারা দুর্বল তাদের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা, কনসালটেশন ফি ইত্যাদি কম নেয়া হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়াতে প্রত্যেক মাসে পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরদিন নিজে নিজে ব্রেস্ট পরীক্ষা করা প্রয়োজন। চল্লিশ বছরের কম বয়সীদের বছরে একবার এবং চল্লিশোর্ধদের বছরে দুইবার চিকিসকের মাধ্যমে তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাহলে সহজেই এ ক্যান্সারের ঝুঁকি রুখে দেয়া সম্ভব।

Related posts