মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১ | ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

Select your Top Menu from wp menus

অবশেষে চলেই গেলেন কবরী : রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শোক

এসবিনিউজ ডেস্ক: অবশেষে চলেই গেলেন বাংলা সিনেমার মিষ্টি মেয়ে খ্যাত অভিনেত্রী, নির্মাতা ও সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরী। করোনা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে ১৩ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত চির প্রস্তান করলেন তিনি; ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ২০মিনিটে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। এর পর মধ্য রাতেই কবরীর ছেলে শাকের চিশতী গণমাধ্যমকে খবরটি নিশ্চিত করেন। এর আগে খুসখুসে কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে করোনার নমুনা পরীক্ষায় দেন তিনি। ৫ এপ্রিল দুপুরে পরীক্ষার ফল হাতে পেলে জানতে পারেন, তিনি করোনা পজিটিভ। ওই রাতেই তাকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে কিংবদন্তির চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আলাদা আলাদা শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী বলেন, কবরী ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশে তার অবদান মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। শোক বার্তায় তাঁরা কবরীর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
কবরীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৭ এপ্রিল দিবাগত রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। অবশেষে ৮ এপ্রিল দুপুরে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে কবরীর জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাকে লাইফ সাপোর্ট নেয়া হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না।
১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের সুতরাং ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কবরীর। ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন জলছবি ও বাহানায়, ১৯৬৮ সালে সাত ভাই চম্পা, আবির্ভাব, বাঁশরি, যে আগুনে পুড়ি। ১৯৭০ সালে দীপ নেভে নাই, দর্পচূর্ণ, ক খ গ ঘ ঙ, বিনিময় ছবিগুলো।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের সদস্যদের সাথে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী । সেখান থেকে পাড়ি জমান ভারতে। কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। তখনকার স্মৃতি স্মরণ করে একবার তিনি বলেছিলেন, সেখানকার এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলাম। কীভাবে আমি মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন সবাইকে ছেড়ে এক কাপড়ে পালিয়ে সেখানে পৌঁছেছি, সে কথা বলেছিলাম। সেখানে গিয়ে তাদের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের দেশকে সাহায্যের আবেদন করি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন কবরী। শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত তিতাস একটি নদীর নাম সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নায়ক রাজ্জাকের সাথে রংবাজ পায় বেশ জনপ্রিয়তা। ১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সাথে সুজন সখী ছাড়িয়ে যায় আগের সব জনপ্রিয়তাকে। এরপর কেবলই এগিয়ে চলা সামনের দিকে। তার জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আগন্তুক, নীল আকাশের নিচে, ময়নামতি, সারেং বৌ, দেবদাস, হীরামন, চোরাবালি, পারুলের সংসার।
৫০ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মত বিখ্যাত অভিনেতাদের সাথে সাফল্যের সাতে কাজ করেছেন কবরী। এমনকি ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন রাজ্জাক-কবরী। তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছিলেন, আমরা এতটাই আবেগ দিয়ে অভিনয় করতাম যে ছবির প্রতিটি দৃশ্যকেই জীবন্ত করে তুলতাম।
২০০৫ সালে আয়না নামের একটি ছবি নির্মাণের মাধ্যমে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন কবরী। এমনকি ওই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে তিনি অভিনয়ও করেছিলেন। এরপর রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য নারী অধিকার ও সমাজসেবামূলক সংগঠনের সাথে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-তে প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীমূলক বই স্মৃতিটুকু থাক।
১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্মগ্রহণ করেন কবরী। তার আসল নাম ছিল মিনা পাল। বাবা শ্রীকৃষ্ণদাস পাল এবং মা লাবণ্য প্রভা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে উঠেছিলেন তিনি। তারপর টেলিভিশন ও সবশেষে সিনেমায়। কবরী বিয়ে করেন চিত্ত চৌধুরীকে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ১৯৭৮ সালে তিনি বিয়ে করেন সফিউদ্দীন সরোয়ারকে। ২০০৮ সালে তাদেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কবরী ৫ সন্তানের মা।
অভিনয়ের জন্য কবরী পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।

Related posts