দাকোপে ফসলের মাঠে নবান্নের ঘ্রাণ


নভেম্বর ২৯ ২০১৭

স্টাফ রিপোর্টার: হেমন্তের বাংলার চিরচেনা রূপ। যদিও গ্রাম বাংলার নবান্নের উৎসব শুরু হয় মূলত অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকে। তবে এখন আগম জাতের ধানের কারনে হেমন্ত ঋতু শুরুর আগে থেকেই নবান্নের ঘ্রান বাতাসে। গগণে সাদা মেঘ দেখি নাতো আর, শরৎ ঋতু ধীরে ধীরে নিয়েছে বিদায়। মাঠ জুড়ে সোনালী আমনের সবুজের সমাহর। সবুজ ধানের বুক চিরে বেরিয়েছে ছড়া। ছড়াগুলো হয়েছে বড়, আর বড় হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।

জেলার দাকোপ উপজেলায় দুটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিধ্বস্ত হয় তিনটি দ্বীপ। বিধ্বস্ত দ্বীপে হয়েছে ধান। যে দিকে তাকানো হয় সে দিকেই দেখা যায় শুধুই ধানের শীষ। ছড়াচ্ছে হেমন্তে আমন ফসলের গন্ধ। কৃষকদের মুখে স্বপ্ন বিভোর সোনালী হাসি। নতুন করে আর কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে এবার আমন ফলন গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কৃষকরা। এরই মধ্যে অনেক জমির ধান আধাপাকা অবস্থায় দোলা খাচ্ছে। আবার কিছু জমির ধানের শীষ বের হচ্ছে।

সরেজমিন উপজেলার তিনটি পোল্ডার ঘুরে দেখা যায়, চালনা পৌরসভা, পানখালী, তিলডাঙ্গা, কামারখোলা, সুতারখালী, বাজুয়া, কৈলাশগঞ্জ, দাকোপ, লাউডোব, ও বানিশান্তা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মাঠ আমন ধানের চাষবাদে ভরে গেছে।

দাকোপের কালিকাবাটি গ্রামের কৃষক চিত্তরঞ্জন মন্ডল জানান, ২০০৭ সালে ১০ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছিলাম। ধান গাছের অবস্থা ছিল খুবই ভালো। স্বপ্ন ছিল সোনালী ফসল ঘরে তোলার। এমন স্বপ্ন বিভোর সময়ে উপকুলে দানবীয় শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় সিডর। সিডরে ধানগাছের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এর ওপর পোকার আক্রমনও চরমভাবে বেড়ে গিয়েছিল। অন্য বছর যেখানে বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ১৮ মণ করে ধান পেতাম। সেবার পেলাম ১০ বিঘায় মাত্র ৫৫ মণ। সারা বছর কীভাবে কাটাতে হবে সে চিন্তা করে তখন বসে থাকতাম। তখন এলাকার কমবেশি সবাই মিলে বোরো আবাদ করি। ধান খুব বেশি না পেলেও খোরাক নিয়ে আর চিন্তা ছিল না।

পশ্চিম বাজুয়া গ্রামের কৃষক ফনিভুষণ মন্ডল বলেন, বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাসে ৩৫ বিঘা জমিতে আউশ চাষ করেছিলাম। প্রথমে ধান গাছের অবস্থা ছিল ভালো। কিছু দিন পরে লবণাক্ত কারনে ধানগাছ মারা যায়। পেলাম মাত্র ৭৬ মণ আউশ ধান। যা গত বছর ২২ বিঘা জমিতে ১৪ থেকে ১৫ মণ পেতাম বিঘা প্রতি।  কিছুটা চিন্তায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম। এরপর আমন চাষ করলাম। ফলন এখন পর্যন্ত খুবই ভালো। প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে ক্ষতির পরিমান পোষাতে পারব।

কামারখোলা গ্রামের কৃষক বিনয় কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ২০০৯ সালে আইলায় প্লাবিত হয় এ অঞ্চল। জোয়ারের পানি ওঠা-নামা করে ২০১০ সাল পর্যন্ত। এ সময় জমিতে আর সোনার ফসলের শীষের দোলা দেখতে পেতাম না। পেশায় ছিলাম কৃষি কাজে নিয়োজিত। তাই পারলাম না আর বসে থাকতে। স্বপ্ন দেখলাম সোনালী ফসল ফলানোর। নিজের ছিল ৫ বিঘা, আর বর্গা নেয় ৫ বিঘা। পানি ওঠা-নামার মাঝে মোটা জাতের ধান চাষ করলাম। ধান গাছের অবস্থা ছিল খুবই ভালো। এক সময় পানির সাথে উঠতে থাকে পলি মাটি। পলি মাটি জমে যাওয়ায় ধান গাছের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।  চিন্তায় পেয়ে বসে কি করে কাটাব সারাটি বছর। এর মধ্যে হয়ে গেল রাস্তার বাঁধ। এলাকার সবাই মিলে করলাম আমন চাষ। ফলনও খুবই ভালো হয়ে ছিল। গেলবার বিঘা প্রতি ২২ থেকে ২৪ মণ পেয়েছি। এবারও ফলন অনেকটাই ভালো।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ২০ জন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, দাকোপের অধিকাংশ কৃষিজমি একসময় ছিল এক ফসলি। ৮০ দশকে কিছু জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে তরমুজের চাষ করা হলেও পরিমানে তা ছিল খুবই কম। কিন্তু সিডরে এলাকার কৃষকেরা বড় ধাক্কা খান। এরপর তারা কৃষিতে বেশি মাত্রায় ঝুকে পড়েন। আয় বাড়াতে এলাকায় তরমুজ চাষ বাড়াতে থাকে। বাড়াতে থাকে সবজির চাষ। এরপর আবার আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় কৃষি খাত। তবে মারাত্মক দুটি প্রাকৃতিক দূর্যোগের পর কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এ অঞ্চলে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে ২৫ হেক্টর জমিতে বোরো, দেড় হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ, ২০ হেক্টর জমিতে আউশ, ৫ হেক্টর জমিতে পাট ও ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ১০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ কমে যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মোছাদ্দেক হোসেন জানায়, এ অঞ্চলের উৎপাদিত সবজি জেলার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। টানা দুটি প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিধ্বস্ত হলে কৃষি কাজে ব্যাপক ক্ষতি হয় জেনেছি। কৃষকদের ফসল উৎপাদনের কোন কৌশল জানা ছিল না। হতাশ হয়ে পড়েছিলও বটে। তিনি আরও জানান গত দুই বছর থেকে বিধ্বস্ত দ্বীপে মানসম্মত, পুষ্টিকর সবজিসহ সকল ফসল ফলাতে সক্ষম হয়েছি। আর খুলনা হতে নলিয়ান অভিমূখে বিশ্বরোড নির্মাণ, বেসরকারি কোম্পানী নির্মাণে আমন চাষ জমির পরিমান কমেছে। তবে প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলে গতবারের তুলনায় এবার ফসল অনেকটা ভালো হবে।

 

এক্সক্লুসিভ

সাক্ষাৎকার

আইন-আদালত

শিল্প-সাহিত্য

ভ্রমণ

ফিচার

পরিবেশ

আবহাওয়া

রাশিফল


Ad Space