শতবর্ষী বৃক্ষ কর্তন করে রাস্তা প্রশস্তকরণঃ তোঘলকী সিদ্ধান্ত!


জানুয়ারি ২৭ ২০১৮

আনোয়ারুল কাদির
‘বন কেটে বসত’ (বসতি) হয়। এখন শোনা গেলো, গাছ কেটে রাস্তা হয়। বেনাপোল থেকে যশোর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করতে শতাব্দির সাক্ষী তিন শতাধিক রেইন ট্রিসহ আড়াই হাজার গাছ কাটতে হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তারা। এসব ‘বৃক্ষকর্তন’ ছাড়া সড়ক স্ফীত করার নাকি কোন উপায় নেই। গত ৬ জানুয়ারী যশোর জেলা প্রশাসকের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের দু’পাশের গাছ কেটে রাস্তা চার লেনে প্রশস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর এ সিদ্ধান্ত নাকি সর্বসম্মতভাবে নেয়া হয়। অর্থাৎ মতবিনিময় সভায় ভিন্নমত আসেনি। খুব স্বাভাবিক এটা যে, মতবিনিময় করতে যাদের আহবান করা হয়েছিল তারা একই ‘ঝাঁকের কৈ”। তা না হলে ইতিহাসের সাক্ষী এসব শতবর্ষী গাছ কাটার বিপক্ষে কেউই যুক্তি দেখাতে পারলেন না?যশোর রোডের দু’পাশের এসব গাছ শুধুই যে বড় আকারের গাছ তা নয়। এসব গাছের সাথে বাঙালির ইতিহাস জড়িত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতির সাথে জড়ানো রয়েছে এসব গাছ। একাত্তরে এ যশোর রোড দিয়েই সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল লক্ষ লক্ষ শরণার্থী। এ পথের দু’পাশের গাছের শীতল ছায়াতেই দু’দ- বিশ্রাম নিয়েছিল পথপ্রান্ত শরণার্থী শিশু-বৃদ্ধরা। এসব বৃক্ষের ঝরে পড়া শুকনো ডাল পাতা দিয়ে আগুন জ্বেলে দু’মুঠো চাল ফুটিয়ে নিয়েছিল তারা। সীমান্তের ওপারে এসড়ক পাশেই গাছের তলায় দীর্ঘসময় অস্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছিল গৃহহারা মানুষ। এ পথ দিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করেছিল, এসব গাছই শত্রু থেকে আড়াল করে রেখেছিল অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের। যুদ্ধের শেষ সময়ে এরাস্তা ধরেই ভারি যুদ্ধযান প্রবেশ করে। যুদ্ধশেষে যশোর রোডের ছায়া ঘেরা এ পথ বেয়েই উৎফুল্ল বিজয়ী বাঙালি ফিরে আসে নিজবাস ভূমে। যশোর রোডের সবগুলো গাছই নীরব নির্বাক স্বাক্ষী।
বিশাল বৃক্ষশোভিত ঐতিহাসিক যশোর রোডকে ঘিরে থাকা শরণার্থীদের নিয়ে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন সুবিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। মুক্তিযুদ্ধের সময় খ্যাতনামা মার্কিন গায়ক বব ডিলার মর্মস্পর্শী সুরে এ কবিতাকে গানে রূপান্তর করে বিশ্ববিবেক নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যশোর রোডের বর্ণনায় রাস্তা এসেছে, শরণার্থীদের অবর্ণনীয় কণ্ঠ যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে এ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষছায়ার বর্ণনাও “লক্ষ শিশু দেখছে আকাশ অন্ধকার/উদর স্ফীত, বিস্ফোরিত চোখের ধার/যশোর রোডে- বিষন্ন সব বাঁশের ঘর/ধুঁকছে শুধু, কঠিন মাটি নিরুত্তর/…..দুইটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষছায় নীরব চোখে আমায় শুধু দেখেই যায়…। অ্যালেন গিনস্বার্গের চোখে বৃদ্ধবৃক্ষের ছায়াতলে শিশুর বোবা দৃষ্টিতে অনেক প্রশ্ন ধরা পড়ে।প্রায় অর্ধশতাব্দি আগের সে বৃক্ষরাজী এখন আরও বৃদ্ধ। এসব শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্বাক্ষী নয়, বৃক্ষরাজী বাঙালির অনেক চড়াই উৎরাই দেখেছে। ১৯৪৭ সালে রাস্তার দেহছিন্ন হতে দেখেছে। তবে বদল হয়নি রাস্তার নাম। বাংলা বিভাগেরও এক শতক আগে ১৮৪২ সালে যশোরের জমিদার কালী পোদ্দার তার মা’কে সোজা পথ দিয়ে গঙ্গাস্নানে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ৫৮ হাজার কড়ি ব্যয়ে যশোরের বকচর থেকে নদিয়ার গঙ্গাঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করেন। আর ঐ রাস্তায় ছায়া দিতে দু’ধারে রোপন করেন দ্রুতবর্ধনশীল রেইনট্রি। সেই গাছগুলোই এখন মৃত্যু আশংকায়।মতবিনিময় সভায় বৃক্ষনিধনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরপরই দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মহামান্য আদালত সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে আদেশ দিয়েছেন। এখন নতুন করে ভাবনার সুযোগ এসেছে। যশোর-বেনাপোল সড়ক যে প্রশস্ত করতে হবে তাতে কারুরই দ্বিমত নেই। বেনাপোল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর। বেনাপোল থেকে চার লেনের রাস্তা নির্মিয়মান পদ্মা সেতুর সংযুক্ত করার মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একই সাথে রেলপথও নির্মিত হবে। ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ের সাথে এ যাতায়াত পথ যুক্ত হবে। এ উন্নয়ন উদ্যোগ এখন আর পরিকল্পনার পর্যায়ে নেই। কার্যকরণও শুরু হয়েছে। আগামী ৬ বছরের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ হবে। পরিবেশবাদী স্থানীয় জনসাধারণ কেউ-ই বলছেন না রাস্তা সম্প্রসারণ বন্ধ করা হোক। রাস্তা প্রশস্ত করতে গাছ কাটার প্রয়োজন হবে কীনা তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। সড়ক বিভাগ যখন গাছ কাটার পক্ষে এগুতে থাকে তখন গণমাধ্যম এ নিয়ে সোচ্চার হলে সড়কবিভাগ তার পূর্বসিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। গত বছর জুলাইয়ে তারা ঘোষণাও দেয় যে গাছগুলো রেখেই দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলকে সংযুক্তকারী যশোর-বেনাপোল সড়ক স্ফীত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু এর ছয়মাস পরই সিদ্ধান্ত পাল্টে গেল। এখন বলা হচ্ছে প্রকল্পটি যেভাবে নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে গেলে গাছ কাটার কোন বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে প্রকল্পটি এমনভাবে কেন নেয়া হয়েছে যাতে করে গাছ কাটার প্রয়োজন পড়ছে। শতাব্দির পুরোনো গাছগুলোকে রেখে রাস্তা কীভাবে প্রশস্ত করা যায় প্রকল্প সেভাবে কেন নেয়া হয়নি। প্রকল্প প্রণেতারা কেন এ চিন্তাটা প্রথম থেকেই মাথায় রাখেননি।এ সড়কের পাশে মাঝেমধ্যে বসতি রয়েছে, বড় স্থাপনা আছে, অবৈধ দখলও আছে বলে তথ্য রয়েছে। রাস্তা প্রশস্ত করতে যেয়ে এদের যেন ‘ডিসটার্ব’ না করা হয় এটা মাথায় রাখা হয়েছে। কারণ এখানে ভোটের প্রশ্ন জড়িত। গাছের তো আর ভোটাধিকার নেই তাদের কর্তন করলে কোন ক্ষতি তো নেই-ই বরং ‘ম্যানেজ’ করে যদি কম দামে গাছগুলো কেনা যায় তাহলে সবদিকেই লাভ।মতবিনিময় সভায় নাকি এমন কথাও এসেছে যে এ পুরনো গাছগুলোর এখন টিম্বার ভ্যালু কমে যাচ্ছে, ডালপালা ভেঙ্গে নাকি দুর্ঘটনাও ঘটছে। সুতরাং দাও কতল করে! শুধু গাছ নয়, মানুষও বৃদ্ধ হলে তার ‘ভ্যালু’ কমে যায়। বৃদ্ধরা সংসারে ‘বোঝা হয়ে দাঁড়ান। কিন্তু তাই বলে কেউ-ই বলে না বৃদ্ধকে মনুষ্য সমাজ থেকে ছেটে ফেল। খুব যদি অসুবিধা হয় তাহলে বড়জোর বৃদ্ধ নিবাসে পাঠানো হয়। কিন্তু বৃদ্ধ বৃক্ষের জন্য তো পৃথক নিবাস করা সম্ভব নয়। তবে এটা তো স্বীকার করতেই হয় যে, বৃদ্ধ বৃক্ষ অনেক সুন্দর। প্রাণ জুড়ানো, দৃষ্টি নন্দন সৌন্দর্য এসব গাছের। যেমন যশোর-বেনাপোল সড়কের আলোচিত বৃক্ষরাজীর।তাহলে কী এসব গাছ রেখে কোনভাবেই সড়ক প্রশস্ত করা যাবে না। নিশ্চয়ই যাবে এবং অনেক সুন্দরভাবেই করা যাবে সেটা। মনে রাখতে হবে এ সড়কের সবটুকু জুড়েই কিন্তু ইতিহাসসমৃদ্ধ এসব বৃক্ষ নেই। অনেক জায়গাতেই রয়েছে কমবয়সী গাছ। অনেক অংশ বৃক্ষশূন্য। এসব জায়গায় রাস্তা প্রশস্ত করতে কোন বাধা নেই। কমবয়সী গাছগুলোর একপাশ কেটে অন্যপাশের গাছ রাখা যেতে পারে এবং বৃক্ষ নিধনের সাথে সাথে কর্তনকৃত বৃক্ষের তিনগুণ বৃক্ষ নতুন করে রোপন ও সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। কিন্তু যেখানে শতবর্ষী গাছগুলো রয়েছে সেখানে করাত কুড়াল লাগানো যাবে না কোন মতেই। এখানে বিদ্যমান সড়ক রেখে, গাছগুলোকে আইল্যা-ে ফেলে, একপাশ অথবা দু’পাশে রাস্তা সম্প্রসারণ করা যায়। এসব আইল্যা-গুলোকে পরিকল্পিতভাবে সৌন্দর্যবর্দ্ধনের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করা যেতে পারে। এসড়কটি সম্প্রসারণের জন্য এ ধরনের নতুন পরিকল্পনা নিলে হয়তো নির্মাণ ব্যয় একটু বাড়তে পারে। এতে করে সড়ক সরলরৈখিক হবে না, কিন্তু এসব গাছসংরক্ষণ করে রাস্তা যদি নির্মিত হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে এ চার/ছয় লেনের রাস্তা যে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন, অনন্য (ইউনিক) রাস্তা হয়ে দাঁড়াবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আদালত সময় দিয়েছে নতুন করে ভাবতে, নতুন পরিকল্পনা নিতে। এ সময়ের মধ্যেই পরিবেশ পরিকল্পনাবিদ, ইতিহাসবিদ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদরা সমন্বিতভাবে যদি নতুন করে এ সড়কের সম্প্রসারণ নক্শা তৈরি করেন তাহলে, তা দেশবাসীর জন্য বড়ই স্বস্তিদায়ক হবে।
[লেখক: শিক্ষাবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সুন্দরবন একাডেমি, খুলনা।]

 

 


এক্সক্লুসিভ


সাক্ষাৎকার

Ad Space

আইন-আদালত


শিল্প-সাহিত্য

Ad Space

ভ্রমণ

ফিচার

Ad Space

পরিবেশ

Ad Space

আবহাওয়া

Ad Space

রাশিফল


Ad Space