বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ ♦ ৫ আষাঢ় ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

প্রতিবাদী চেতনার মশাল

সেলিনা হোসেন

বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, যার জাতীয় সন বাংলা। বাংলা নববর্ষ বাঙালির একটি বড় ধরনের ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন উৎসব। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সব মানুষের মহামিলন ক্ষেত্র এই দিন। তাই এই দিন শুধু উৎসব নয়; আত্মিক শক্তিও। বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপন এখনও বাঙালি জাতিসত্তা রক্ষার প্রধান নিয়ামক। যতই মৌলবাদের উত্থান ঘটুক না কেন, মানুষের অন্তর্নিহিত চেতনায় তার ভিতটি বড় মজবুত। সেটা থেকে তাদেরকে কেউ দূরে সরিয়ে নিতে পারবে না। মৌলবাদের ছোবলকে প্রতিহত করবে এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এর শিকড় প্রোথিত আছে বাংলা নববর্ষে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বাঙালির নববর্ষ ভিন্নমাত্রা লাভ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ বাঙালির এই উৎসব সম্পর্কে জানে এবং আগ্রহভরে প্রবাসী বাঙালিদের অনুষ্ঠানে আসে। বিশেষ করে এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অসাম্প্রদায়িক মানবিক বোধ, বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম উপাদান হিসেবে এর শিকড়সন্ধানী প্রেরণা মানুষকে আগ্রহী করে তোলে।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। দেশজুড়ে এই উৎসবের আয়োজন হয় বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায়। মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। মানুষ জড়ো হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রাঙ্গণে। নববর্ষের পোশাকের ভিন্নতাও দারুণভাবে দৃষ্টিনন্দন। লাল-সাদা রঙ স্নিগ্ধতার আবেশে ভরিয়ে তোলে। খাবারের বৈচিত্র্যও নববর্ষ অনুষ্ঠানের একটি দিক। জাতি খুঁজে নেয় যা কিছু তার নিজস্ব, তার সবটুকু। সেই সবটুকুর গৌরব প্রতিটি মানুষের বুকজুড়ে থাকে বলে বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট নেই।
২০১২ সালে নববর্ষ উপলক্ষে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এটি বাঙালি সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্ব লাভের নজির। অন্য দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শুধু নয়, সরকারি পর্যায়েও বাংলা নববর্ষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এটি একটি দিক। আরেকটি দিক আছে। গত কয়েক বছর ধরে নববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার দু’পাশে মিলন মেলা আয়োজিত হয়। ২০১২ সালে পঞ্চগড় উপজেলার অমরখানা সীমান্তে বসেছিল এই মেলা। দু’দেশে বাস করা আপনজনের সঙ্গে দেখা হয় নববর্ষের এই দিনে। গরিব মানুষ পাসপোর্ট-ভিসা করে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারে না। তাই নববর্ষের উৎসবের দিনের জন্য তারা অপেক্ষা করে। স্বজনদের জন্য পিঠাপুলি, মোয়া-মুড়ি বানায়, নতুন কাপড় কেনে। দুপুর ১২টায় সীমান্তরক্ষীরা অনুমতি দিলে বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারের এপাশে দাঁড়ায়। ভারতীয় নাগরিকরা তাদের সীমান্তে দাঁড়ায়। শুরু হয় হাসিকান্না, আনন্দ-খুশির বন্যা, উপহার বিনিময়। আবেগের উৎসমুখ খুলে যায়। মিটে যায় অনেক দিন ধরে স্বজনদের না দেখার তৃষ্ণা। কাঁটাতারের ওপর হাত রেখে কিংবা চিবুক ঠেকিয়ে কথা বলে মন ভরে না। বুকের মধ্যে হাহাকার জেগেই থাকে। আবার পহেলা বৈশাখের উৎসবের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। একসময় ফুরোয় সময়। সীমান্তরক্ষীরা নিজ নিজ দেশের লোকদের সরিয়ে দেয় কাঁটাতারের সীমানা থেকে। জেগে থাকে সংস্কৃতির প্রবল শক্তি। কাঁটাতারের বেড়ার সাধ্য নেই সেই শক্তিকে উপেক্ষা করার। কাঁটাতারের গায়ে লেগে থাকে ৮০ বছরের নারী চুনিবালার চোখের জল। একই সঙ্গে আটকে থাকে ইউনেস্কো সনদের প্রথম পঙ্‌ক্তি-Affirming that cultural diversity is a defining characteristic of humanity. . এভাবেই সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে মানবিকতার মৌলিক শর্ত।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উৎসব বিষয়ে ‘উৎসবের দিন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মানুষের উৎসব কবে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেইদিন। … প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী- কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ।’
উৎসবকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই মহৎ ব্যাখ্যার উদাহরণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালির আত্মশক্তির উৎসব। মনুষ্যত্বের জাগরণের উৎসব। গ্রামীণ অর্থনীতি হালখাতার উৎসব। মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমাদের প্রত্যাশা, ১৪২৬ বঙ্গাব্দের নববর্ষ বাঙালির জীবনে শুভবার্তা বয়ে আনুক- যেন এই জাতি মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে মহৎ হয়। অরাজকতা যেন জাতির মনন-শক্তিকে গ্রাস না করে।
কিন্তু ১৪২৬ বঙ্গাব্দের বর্ষবরণ উৎসব শুরুর আগেই এমন একটি পৈশাচিক বর্বরতার নজির দেখা যায় বাংলাদেশের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শ্নীলতাহানি করেছিল ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির। মেয়ের এই খবর পেয়ে রাফির অসম সাহসী মা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বর্বর অধ্যক্ষ মামলা তোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। না পেরে নিজের পকেট বাহিনীকে দিয়ে কেরোসিন ঢেলে রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার নৃশংস বর্বরতার দৃষ্টান্ত দেখায় দেশবাসীকে। জ্বলে ওঠে প্রতিবাদের আগুন। অগ্নিদগ্ধ নুসরাত প্রতিবাদী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নিজের হৃদয়ে লালন করে বৈশাখী ঝড়। নিজের লেখা দিয়ে ভরিয়ে ফেলে প্রতিবাদী চেতনা- ‘আমি লড়বো শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। … মরে যাওয়া মানেই তো হেরে যাওয়া। আমি মরব না, আমি বাঁচব। আমি তাকে শাস্তি দেব, যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। … আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেব ইনশাআল্লাহ।’
এই প্রতিবাদী চেতনার মশাল জ্বালিয়ে নিভে গেছে সচেতনবোধের সাহসী মেয়েটির প্রাণপ্রদীপ। সবার কাছে প্রার্থনা, এবার বর্ষবরণের উৎসব নুসরাতকে উৎসর্গ করা হোক। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ফুটে থাকুক নুসরাতের দীপ্ত চেতনার সাহসী মুখমণ্ডল। ও তো চেয়েছিল তাপসনিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে উড়িয়ে দিতে। নববর্ষের উৎসবে অমর হয়ে থাকুক নুসরাতের প্রতিবাদী মশাল। শুভ নববর্ষে জয় হোক মানবিক বোধের। স্বাগতম ১৪২৬। সূত্র: সমকাল

Related posts