বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ ♦ ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

Select your Top Menu from wp menus

‘প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত পরিবর্তন আনব’

এমএ মান্নান, দায়িত্ব পেয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রীর। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন জনপ্রিয় একটি দৈনিকের সঙ্গে। তা হুবহু তুলে ধরা হলো-
নতুন পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে কোন কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন?
প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি যে আস্থা রেখেছেন সেটি ধরে রাখতে শতভাগ উজাড় করে দিয়ে কাজ করব। আমার প্রথম কাজ হবে এ মন্ত্রণালয় সম্পর্কে বোঝা, জানা এবং জ্ঞান অর্জন করা। দলের এবং প্রধানমন্ত্রীর যে রাজনৈতিক লক্ষ্য আছে; যেমন, মানুষের উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য নিরসন, গ্রাম ও শহরের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনাসহ সব ধরনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট থাকব। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা বা কাজ আসবে সেগুলো করব। আমাদের ঘরে ফিরে আসতে হবে। ঘর বলতে দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। এসবের মাধ্যমে আমরা দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে চাই। দেশে উন্নয়নের যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলমান রয়েছে, সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমার প্রধান কাজ। অর্থাৎ, এটিকে আরো বেগবান ও মানবিক করা। পিছিয়ে পড়া মানুষকেও উন্নয়নের ধারায় নিয়ে আসতে চাই। বিশেষ করে উন্নয়নকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে চাই। রাজনৈতিকভাবে আমাদের যে অঙ্গীকার আছে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য যথাযথভাবে কাজ করে যাব। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের কেন্দ্র থেকে যেসব নির্দেশনা আসবে, আমি সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।
সব কাজই দ্রুত করতে চাই, তবে অন্ধের মতো দ্রুত করতে চাই না। গতি হতে হবে সুষম। দ্রুত করতে গিয়ে অর্থের অপচয় যেন না হয়, সেটিও দেখব। সুষম মাত্রায় কাজের গতি ধরে রেখে গুণগত পরিবর্তন আনাই হবে আমার অন্যতম কাজ। প্রয়োজনীয় সমর্থন দিয়ে যথাসময়ে কাজ করে নেয়াই হবে আমার কাজ। সবকিছু সমন্বয় করেই এগিয়ে যাব। আমাদের অগ্রগতি কেউ আটকাতে পারবে না।
দারিদ্র্য বিমোচন ও পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন কীভাবে করবেন?
যারা দরিদ্র আছেন, তারা নিজের দোষে দরিদ্র নন। এ দারিদ্র্যের পেছনে অনেক ঐতিহাসিক কারণ আছে। তারা বঞ্চনার শিকার, তারা ইতিহাসের শিকার। এর সঙ্গে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অনেক বিষয় জড়িত আছে। তাই দারিদ্র্য বিমোচন ও পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমরা যে কাজগুলো করছি, সেগুলোকে আরো মানবিক করব। এজন্য পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে এগিয়ে আনতে কর্মসূচি নেয়াই হবে আমার কাজ। বিশেষ করে হাওড় এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে রয়েছে। সেখানকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে চেষ্টা থাকবে। সেখানকার প্রতিনিধি হিসেবে এটিকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। যেহেতু আমি সারা দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি, তাই হাওড় অঞ্চলের পাশাপাশি নদীভাঙন এলাকা, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টাও থাকবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, চরাঞ্চলের বাসিন্দারাসহ সব ধরনের পিছিয়ে পড়া
মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে আমি সচেষ্ট থাকব, নিজেকে নিবেদিত করব। তবে আমি কোনো বিপ্লবী নই। আমি বিপ্লব করতে আসিনি। চেষ্টা থাকবে নিয়মনীতি ও সাধ্যের মধ্যে থেকে কাজ করে যাওয়া। দেশে ঐতিহাসিকভাবে বহু অবিচার ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। সেগুলো দূর করতে নিজের মতো করে কাজ করব। সুষমভাবে সামগ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন করতে চাই। এরই মধ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছাড়াও এ বিষয়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে আলোকে কাজ করলে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবেই।
এডিপির গুণগত বাস্তবায়ন কতটুকু নিশ্চিত করবেন?
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন আমার জন্য একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর চেয়ে বাস্তবায়নে গুণগত মান নিশ্চিত করার দিকে আমার প্রচেষ্টা থাকবে বেশি। চেষ্টা করব যাতে গুণগত মানসম্পন্ন এডিপি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়। নতুন নতুন প্রকল্প পাস হয়। প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে, অর্থের জোগানও বাড়ছে। এখন গুণগত মান বাড়াতে হবে। এডিপি গুণগত বাস্তবায়নে সব ধরনের পদক্ষেপ থাকবে। তবে এসব কাজ করতে আমি নতুন কোনো টিম করছি না। কারণ একটি দারুণ ও কর্মঠ টিম পেয়েছি। সেই টিমকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একটি টিম হিসেবে কাজ করবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সবাই কাজ করছে। তবে আমি চাচ্ছি শুধু পরিচ্ছন্নতা আর একটু গতি বাড়াতে। আমাদের কাজের মধ্যে কিছু স্তর রয়েছে, সেগুলো ছেঁটে ফেলা বা এক পাশে ফেলে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা এগুলো হয়তো আগে করিনি, তবে এখন থেকে সেগুলোকে পরিষ্কার করা হবে, সংস্কার করা হবে। সংস্কার করতে গিয়ে গতি যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকেও লক্ষ রাখা হবে।
কিছু প্রকল্প পিছিয়ে পড়েছে এটি সত্য। এসব প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। আগের পরিকল্পনামন্ত্রী দারুণ গতিশীলতার মাধ্যমে কাজগুলোকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সেই গতি ধরে রাখার পাশাপাশি আরো গতিময় করতে আমি চেষ্টা করব। যে রিভাইজড টাইম ফ্রেম আমাকে দেয়া হয়েছে, সেই সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএমইডিকে শক্তিশালী করবেন কীভাবে?
এ সংস্থাটি করার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। মানসম্পন্ন কাজের নিশ্চয়তার জন্যই এটি গঠন করা হয়। আমি সেটির কিছুটা হলেও দেখেছি। মাঝে কিছুটা সময় সংস্থাটি পিছিয়ে পড়েছিল। আমাদের সরকার সেটিকে গতিশীল ও কার্যকর করেছে। প্রকল্পের গুণগত মানের জন্য এ সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। সামনের দিনেও তা ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ফারাক আছে কিনা, সেগুলো দেখা হবে। এসবের বেশকিছু কাজ করে থাকে আইএমইডি। ফলে তাদের শক্তিশালী করতে কোনো ধরনের দ্বিধা থাকবে না। প্রয়োজনে লোকবল, সমন্বয় ও অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা ও ধারণার বাইরে কাজ করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আমার উচ্চাশা আছে, আশা করি প্রতিষ্ঠানটিকে আরো উজ্জীবিত করতে পারব। উদ্দেশ্য শুধু একটাই, গুণগত মান ধরে রাখা। তাছাড়া একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ কী পাবে, সেটিও মূল্যায়ন করা হবে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে নতুন কোনো পরিকল্পনা নেবেন কি?
অর্থনীতি নিজেকে নিজে ফিট করে। অথরিটি এখানে এক্সিলারেশন করে, গাইডেন্স করে সঠিক পথে নিয়ে থাকে। সামষ্টিক অর্থনীতির প্যারামিটারগুলো যেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রার মধ্যে থাকে সেটি দেখা হবে। সূচকগুলো যেন টেকসই থাকে সেটি করা হবে। হঠাৎ করে বৃদ্ধি আবার হুটহাট পতন, এটি যেন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। উন্নয়ন বাড়াতে হলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এজন্য শুধু লেকচার দিয়ে হবে না। প্রকৃতপক্ষে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা তৈরি করেই কাজে নামতে হবে। তাহলেই কাজকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। মানুষকে কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তারা কাজ করলেই সম্পদ সৃষ্টি হবে। সম্পদ সৃষ্টি হলেই জিডিপি বাড়বে। মেশিন পরিচালনার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হবে। এটা করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে রাতারাতি হবে না, একটু সময় লাগবে। আশা করি, এর সুফল দেশের মানুষ পাবে।
মেগা প্রকল্পে গতি আনতে কী করবেন?
বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের দক্ষ জনবলের ঘাটতিও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দেয়। আবার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণেও অনেক ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগে। তবে সেটি আর হবে না। অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে এসব প্রকল্প। আমাদের অভিজ্ঞতা এখন অনেক বেশি পরিপক্ব। তাছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চলমান মেগা প্রকল্পে (ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত) ফিড দেয়া। এসব প্রকল্পে প্রচুর অক্সিজেন প্রয়োজন। সময়মতো সেই অক্সিজেন সরবরাহ অব্যাহত রাখা। অক্সিজেন অর্থ থেকে আসবে। সময়মতো সেটা সরবরাহের ব্যবস্থা করা। মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে। এসব প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সার্বিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
বৃহৎ প্রকল্পকে মেগা প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করতে সেগুলোকে ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং টাস্কফোর্সের আওয়ায় আনা হয়েছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, পদ্মা রেলসেতু নির্মাণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু-কক্সবাজার এবং রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) ডেভেলপমেন্ট। এছাড়া পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল পাওয়ার নির্মাণ এবং মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পগুলো তদারকির কাজ করছে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং টাস্কফোর্স।
সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন?
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, সামনের দিনে আরো চরম ডানপন্থীর উত্থান হবে। যেটি আমাদের জাতির মর্মমূলে আঘাত করবে, আমাদের নীতিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করবে। সেটিকে মোকাবেলা করব। আমাদের সরকার গত ১০ বছরে যে উন্নয়ন করেছে, জীবনযাত্রার মান যেভাবে উন্নয়ন করেছে, সেটিকে আরো প্রসারিত করতে হবে। সেখানে নতুনত্ব ও উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োজন হবে। সাক্ষরতার হার আরো বাড়াতে হবে। শিক্ষার আলো সবখানে পৌঁছে দিতে হবে। বিদ্যুৎ সুবিধার যে প্রসার হয়েছে সেটিকে টেকসই, নিশ্ছিদ্র, নিরাপদ, স্থায়ী করতে হবে। বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়নের যে কাজ চলমান রয়েছে, সেগুলোকে যথাসময়ে শেষ করার পাশাপাশি যথাযথ মানে উন্নীত করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ ছাড়াও আরো যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোকে মোকাবেলা করেই আমরা সফল হব। বিশ্ব অর্থনীতিতে আমাদের অবস্থানকে আরো সুসংহত করব। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা অবশ্যই সফল হব। (দৈনিক বণিক বার্তা থেকে নেয়া)

Related posts