মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ ♦ ৪ পৌষ ১৪২৫

Select your Top Menu from wp menus

পুলিশ কবে বন্ধু হবে?

দীপক রায়: মানুষের শান্তি রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা দীর্ঘ ইতিহাস রচনা করেছে। প্রাচীন যুগে রোম শহরে পুলিশি ব্যবস্থা ছিল বলে অনেক সূত্রে জানা যায়। মনুসংহিতা,চিত্রলিপিতে স¤্রাট অশোক এবং প্রখ্যাত ভ্রমণকারিরা আমাদের ইতিহাস রচনার মূল উৎস। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রাচীন যুগে ভারত বর্ষে গুপ্তচর পুলিশের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে। শিল্প বিপ্লবের কারনে ইংল্যান্ডে সামাজিক ব্যবস্থায় অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় স্যার রবার্ট পিল একটি নিয়মতান্ত্রিক পুলিশ বাহিনীর কথা কল্পনা করেন। ১৮২৯ সালে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে পুলিশ গঠনের বিল আনেন। এর ফলে গঠিত হয় লন্ডন মেট্রো পুলিশ। অপরাধ দমনে বা প্রতিরোধে এর সাফল্য শুধু ইউরোপে নয় সাড়া ফেলে আমেরিকাতেও।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা অসাধারণ শক্তি ও শাহস যোগ করেছিল। যুদ্ধে একজন ইন্সপেক্টর জেনারেল, বেশ কয়েকজন এএসপিসহ বহু পুলিশ সদস্য শহীদ হন। ২০১৩-২০১৪ সময়ে জামাত বিএনপির আগুন সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭ জন পুলিশ কর্মী। এদের আত্মত্যাগের কথা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।

বাংলাদেশ পুলিশ দেশের প্রধান অসামরিক আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থা। বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংস্থাটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। চুরি ডাকাতিরোধ, ছিনতাই প্রতিরোধ,দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিভিন্ন অপরাধ দমন। জনসভা, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ পুলিশ সরাসরি নিয়মতান্ত্রিকভাবে অংশগ্রহণ করেন। সবমিলে পুলিশ বাহিনী দেশের শান্তি রক্ষায় একটি বড় দায়িত্ব পালন করার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু মাঝে মধ্যে কিছু কিছু পুলিশ কর্মীর অপকর্মে শান্তি বিঘিœত হচ্ছে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে পুলিশের প্রতি।

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের এক ডিআইজি নারী সংক্রান্ত ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার পাত্র হয়েছেন। গত বছরের ১৪ জুলাই পান্থপথের বাসা থেকে মরিয়ম আক্তার ইকো নামের টেলিভিশনের এক সংবাদ পাঠিকাকে তুলে নিয়ে ১৭ জুলাই তাকে বিয়ে করেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার(ডিআইজি) মিজানুর রহমান। বিয়ে করেও বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। যাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করেছেন তাকে নাকি আবার বিভিন্ন সময় মারধর করেছেন মিজান। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের করা মামলায় ইকোকে কারা ভোগও করতে হয়। এ ঘটনায় অনেক অসহ্যের পর গণমাধ্যমের সামনে মুখ খুলেছেন ইকো। তাঁর দেওয়া ভাষ্যমতে সমাজের বেশ কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত হাইপ্রোফাইল মেয়ের জীবন ধংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন ডিএমপির এ অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। তাঁর ফাঁদে পড়ে নষ্ট হয়েছে অনেক মেয়ের সুখের সংসার। একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি যদি এমন হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কার কাছে নিরাপত্তা চাইবে? কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর একটি কথা দেশবাসীকে মুগ্ধ করেছে। পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি বলেছেন ক্ষমতা উপভোগের বিষয় নয়, জনগণকে সেবা দেয়ার বিষয়। কিন্তু মিজানের মত পুলিশ কর্মকর্তারা কি কখনও ভেবে চিন্তে ক্ষমতার ব্যবহার করেন? যদি করতেন তাহলে পুলিশের অপকীর্তির কথা বার বার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হত না, দেশবাসী তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হতেন না। এটাও সত্য যে কারো ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য গোটা পুলিশ বাহিনীকে দোষ দেওয়া যাবে না। তবে তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। ভুক্তভোগী ইকোর মুখে মিজানের এমন ঘটনার রোমহর্ষক বর্ননা দেশবাসীকে হতবাক করেছে। টক অব দি কান্ট্রিতে রূপ নিয়েছে মিজান ও ইকোর এ ঘটনা। বিভিন্ন মহলের চাপে অবশ্য ডিআইজি মিজানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

পুলিশের অপরাধ কর্মের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফে ১৭ লাখ টাকাসহ ডিবি পুলিশের সাত সদস্য গ্রেপ্তার হন। অন্য ঘটনার মধ্যে ফরিদপুর  জেলা পুলিশ সুপার সুভাষ সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ৮ কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ। গত বছর নভেম্বরে যশোরের কেশবপুর উপজেলায় গভীর রাতে তল্লাশির নামে এক বাড়িতে ঢুকে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের অভিযোগ আসে পুলিশের পাঁচ সদস্যসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে। এ বছরের ৯ জানুয়ারী খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় দশম শ্রেনীতে পড়–য়া এক স্কুল ছাত্রীকে পুলিশ সদস্যরা উত্ত্যক্ত করলে তার ভাই প্রতিবাদ করে। পরে পুলিশ উক্ত ছাত্রীর ভাইকে বাইনতলা পুলিশ ফাড়িতে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালায়। এ অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ফাঁড়ির ১২জন পুলিশ সদস্যের সবাইকে প্রত্যাহার করা হয়। গত ৪ জানুয়ারী ঝিনাইদহের মহেশপুরে পুলিশের সামনে বাসে ডাকাতি ও কর্তব্যে অবহেলার কারনে মহেশপুর থানার দুই কর্মকর্তাসহ আট পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করেছে কর্তৃপক্ষ। মানুষের বন্ধু পুলিশ এটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আংশিক সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশকে রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। তাদের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমাগত। প্রতিদিন পুলিশের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ জমা পড়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সিকিউরিটি সেলে। এসব অভিযোগের বেশিরভাগ কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশের বিরুদ্ধে। সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারী থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে সিকিউরিটি সেলে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাম মাত্র শাস্তি দেওয়া হয়, এতে ওই পুলিশ সদস্যের অপরাধ প্রবনতা নিবৃত হওয়ার চেয়ে পূর্বের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তিতে সে আরও বড় অপরাধে নিজেকে সম্পৃক্ত করে।

পুলিশের অপরাধ গোনাটা আমাদের কাজ নয়। জনগণ পুলিশকে নিয়মতান্তিকভাবে, নিরপেক্ষভাবে তার বিপদে আপদে কাছে পেতে চায়। কিন্তু ঘটে তার উল্টো এবং সমস্যাটা সেখানে। এখনও  গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ পুলিশকে দেখলে ভয় পায়। দূর থেকে পুলিশ দেখলে অন্য পথে হাঁটে। সাধারণ মানুষের বক্তব্য পুলিশ একটি আতংক যত দূরে থাকে ততই ভালো। পত্র পত্রিকাতে আরও একটি খবর প্রায় দেখা যায়। থানা সময় মত অভিযোগ না নেওয়ার কারণে আসামী পালিয়ে গেছে। ক্ষমতাসিন দলের নেতা/সদস্যদের  নামে একাধিক মামলা থাকা সত্বেও পুলিশের সাথে তাদের এক সাথে গাড়ীতে, ভোজে এবং আড্ডায় দেখা যায়। এগুলি কি প্রমাণ করে যে পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ? থানার দেওয়ালে সিটিজেন চার্টারে যা লেখা থাকে তার কতটুকু সুবিধা জনগণ ভোগ করতে পারে তা থানায় না গেলে বুঝা যাবে না। পকেটে পয়সা না থাকলে থানার সুবিধা ভোগ করা যায় না। থানাতে এখনও পয়সা না দিলে জিডি, মামলা কিছুই  হয় না বিষয়টি ভুক্তভোগি সবাই জানেন। বিবাদির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে মামলার ধারা কমাতে অনেক সময় পুলিশ সদস্যরা ভিকটিমকে চাপ দিয়ে পূনরায় আবেদন সংশোধন করতে বলেন।  পুলিশের আদায়কারী নামে অলিখিত একটি পদের সদস্যরা গ্রাম গঞ্জের চোরা কারবারি, মাদব বিক্রেতা, অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে থানার নামে টোল আদায় করে থাকে। এসব ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট। আমাদের দেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে পুলিশের এ ধরণের আচরণ কোনো শুভ লক্ষণ নয়। পুলিশ বাহিনীকে মানুষের আস্থা লাভ করতে হবে, বিশ্বাস অর্জন করতে হবে তাহলে মানুষ পুলিশি সেবা পেতে এগিয়ে আসবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশি সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সবিশেষ  প্রত্যাশা,পুলিশ জনগণের বন্ধু হোক এবং সঠিক দায়িত্ব পালন করে দেশ ও বিদেশে সেবার ক্ষেত্রে আাে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।

লেখক: দীপক রায়(দৈনিক যুগান্তরের দাকোপ প্রতিনিধি)

 

 

 

Related posts