শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯ ♦ ৮ চৈত্র ১৪২৫

Select your Top Menu from wp menus

পরিত্যক্ত খুলনা পাবলিক হলের স্থানে তৈরি হচ্ছে সিটি সেন্টার

প্রবীর বিশ্বাস: খুলনা শহরে গত শতকে আধুনিক নির্মাণশৈলীর অন্যতম স্থাপনা পাবলিক হল। রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাটকসহ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মিলনায়তনটি। কিন্তু হলটি চালু হওয়ার মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দুর্নীতি, নির্মাণে ত্রুটি এবং নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার করায় অল্প সময়ের মধ্যে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। হলের বিভিন্ন দেয়ালে ফাটলসহ ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়া শুরু করে। নিরাপত্তার কারণে ২০১১ সালে বড় মিলনায়তনটি ও ২০১২ সালের ডিসেম্বরের ১১ তারিখে পুরো ভবন বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। বুধবার (৯ জানুয়ারি) মেয়র এর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি দল হলটি পরিদর্শন শেষে ৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে।
৯০ দশকের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বিশাল কমপ্লেক্সটি ছিল খুলনা মহানগরীর ট্রেডমার্ক। সূত্রমতে, খুলনা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের উদ্যোগে মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র নয় রাস্তার সঙ্গম মুখে শিববাড়ী এলাকায় এক দশমিক ৭৫ একর জমির উপর ‘পাবলিক হল কমপ্লেক্স’ নাম নিয়ে ভবনটির কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। পাইলিংয়ের শেষ দিকে ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর কাজ আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) প্রথম মনোনীত মেয়র হিসেবে ১৯৮৮ সালে দায়িত্ব পান কাজী আমিনুল হক। তিনি এক কোটি টাকা থোক বরাদ্দ এনে ১৯৮৯ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেন। কিন্তু একতলা ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের আগেই ১৯৯০ সালে আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে শেখ তৈয়েবুর রহমানকে কেসিসি’র মেয়র হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সময়ে তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যায়ে হলের মূল সুপার স্ট্রাকচারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। দৃশ্যমান বর্তমান ভবনটি নির্মাণের জন্য ব্যয় হয় এক কোটি সাড়ে ৩১ লাখ টাকা। কাজটি করেছিল তমা এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে সৌন্দর্যবর্ধন, চেয়ার-টেবিল, সাউন্ড প্রুফ সিস্টেম ও আনুষঙ্গিক খরচসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটিতে। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ‘জিয়া হল’ নামকরণ করে ভবনটির উদ্বোধন করেন এবং ১৯৯৫ সালে এটি ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় কেসিসি।
প্রায় ৩০ হাজার ৩০ বর্গফুট আয়তনের এই হলের যাত্রা শুরু হয় এক হাজার ২০০ আসন বিশিষ্ট মিলনায়তন, ২০০ আসন বিশিষ্ট শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনার কক্ষ, দুই হাজার ৫০০ বর্গ ফুট আকারের দুটি লাউঞ্জ, মঞ্চসংলগ্ন আসবাবপত্র কক্ষ, তিনটি মহরতকক্ষ, একটি বিশ্রামকক্ষ, দুটি লেডিস কর্নার, একটি নামাজ ঘর, মেকআপ কক্ষ, অফিসসহ নানা সুবিধা নিয়ে। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে হলের নামকরণ নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই সময় থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে জিয়া হলের পরিবর্তে দাওয়াত কার্ড বা পোস্টারে ‘পাবলিক হল’ লেখা হতো।
২০০৭ সাল থেকে মূল ভবনের পলেস্তরা ও ঢালাই খসে পড়তে শুরু করলে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেস্টা আনোয়ারুল ইকবাল হলের সংস্কার কাজের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। এসময় হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সংযোজন এবং সংস্কার করতে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষকরা একটি সমীক্ষা চালানোয়। পরিদর্শন শেষে তারা ভবনটি আর মেরামত না করে ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন। এরপর ২০০৯ সালে হলের ভেতরেই খুলনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি প্রকৌশলী ও স্থপতিদের নিয়ে সভা করেন তৎকালীন মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। তারাও নতুন ভবন নির্মাণের পরামর্শ দেন। এরপর ২০১২ সালে জিলা হল কমপ্লেক্স পরিত্যক্ত ঘোষণার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে কেসিসি। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ মে বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক এবং কেসিসির প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে কনডেমনেশন কমিটি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি ২০১৪ সালের ৩ জুন ভবনটির মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে দেয়। কমপ্লেক্সের ভগ্নাবশেষ মূল্য নির্ধারণ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল প্রকৌশলীরা। অপরদিকে মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বরাদ্দকৃত টাকা সংস্কার কাজে না লাগিয়ে ঔ স্থানে ‘সিটি সেন্টার’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন এবং ২০১২ সালের ২৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল। যা পরবর্তীতে স্থবির ছিল।
বুধবার (৯ জানুয়ারি) বেলা ৩টায় কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া, জেলা প্রশাসকসহ কেসিসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা হলটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে হল চত্ত্বরে তারা সভাও করেন। সেখানে গণপূর্ত বিভাগ-১ এর সুপারেনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াসিফ আহমেদকে প্রধান করে ৭ সদস্যের টেকটিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে প্রতিবেদন জমা দেবে। পরবর্তীতে এটি অপসারণ ও নতুন ভবন নির্মানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সিটি মেয়রের সিটি সেন্টার নামে ২১ তলার একটি ভবন নির্মান করার পরিকল্পনা রয়েছে।

Related posts