রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ ♦ ২ আষাঢ় ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

ঘুরে দাঁড়াতে পারল না কংগ্রেস

এসবিনিউজ ডেস্ক: ২০১৪ সালে নির্বাচনে মোদিসুনামির পর রাজনৈতিক বিশ্নেষকসহ বিভিন্ন মহল আশঙ্কা করেছিল, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তো কংগ্রেস? সেই নির্বাচনে মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছিল দলটি। শুধু শতবর্ষী দল নয়, ভারতে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে এত বড় ধাক্কা খাওয়ার কারণেই হয়তো প্রশ্নটা উঠেছিল। পরাজয়ের ব্যবধানের হিসাবে প্রশ্নটাও যথার্থ ছিল। ঘুরে দাঁড়াতে সচেতন মহলের সেই প্রশ্নের ওপর পরীক্ষা দেওয়ারও দীর্ঘ পাঁচ বছর সময় পেয়েছিল রাহুলের দল। কিন্তু তেমন লাভ হয়নি। আগের সব শঙ্কাই সত্যি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফলে আবারও মোদিঝড়ে উড়ে গেছে তারা।

এবার কংগ্রেসের ভরাডুবির আভাস মিলেছিল আগেই। নির্বাচনে প্রচারের সময়ই দলগুলোর অবস্থান মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সবার কাছে। বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশের পর তা আরও খোলাসা হয়। যদিও বিরোধী শিবিরগুলো কোনোভাবেই আস্থায় নিতে পারছিল না সমীক্ষাগুলোর ফল। দাবি করা হচ্ছিল, মোদির পক্ষে ঝড় তোলার কৌশলের অংশ হিসেবেই ওইসব জরিপ। রাজনীতির মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস নেতাকর্মীরাও ভোটারদের বলে আসছিলেন, হতাশ হবেন না; মূল চমক অপেক্ষা করছে বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ২৩ মে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার দিন। নির্ধারিত দিনে ফল তো ঘোষণা হলোই, তবে হালে এবারও পানি পেল না ভারতের প্রাচীনতম দলটি। অর্থাৎ আবারও দিল্লির মসনদ মোদির বিজেপির দখলেই থেকে গেল। আসন সংখ্যায় গতবারের চেয়ে কংগ্রেস এগিয়ে থাকলেও সময়ের আবর্তে দলটির জনপ্রিয়তা যে নিম্নমুখী হয়েছে, তা বলাই যায়। কারণ জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেসের মতো দলের পাঁচ কিংবা দশটি আসন বৃদ্ধি বা কমার হিসাব চলে না। সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের বিচার করা হয়।

কংগ্রেসের কেন এই হাল? বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্নেষণে বলা হচ্ছে, দুর্বল নেতৃত্ব, বিজেপিবিরোধী ইস্যু চাঙ্গা করতে ব্যর্থতা, আঞ্চলিক দলের আস্থাহীনতা, মোদিঝড় এবং পারিবারিক রাজনীতির মানুষের প্রতি অনীহার কারণেই রাহুলের দলের এ ভরাডুবি।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেন, সোজা কথায়, আমার চিন্তার কোথায় ভুল ছিল, তা এখন আলোচনার সময় নয়। কারণ ভারতের জনগণ পরিস্কারভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নরেন্দ্র মোদিই আবার তাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন। একজন ভারতীয় হিসেবে জনগণের সে সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। তিনি নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপিকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান।

গতবার নির্বাচনের পর সে সময়ের শাসক দল কংগ্রেস নিয়ে একটি কথা সবার মুখে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সমালোচকরা বলতে থাকেন, নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে হেরে দলটি শুধু ক্ষমতা হারায়নি, বিরোধী দলের মর্যাদা রক্ষায়ও ব্যর্থ হয়েছে। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির কাছে ধরাশায়ী হয়ে শাসক থেকে শূন্যে নেমে আসে কংগ্রেস। রাজস্থানসহ অন্য রাজ্যেও একই হাল হয়েছিল তাদের। সে সময় দুর্নীতি, অপশাসন, সিদ্ধান্তহীনতা, শরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্বসহ নানা তকমা লেগেছিল দলটির গায়ে, যার দরুন ৪৪ আসনই হয়তো প্রাপ্য ছিল তাদের। তবে অনেকেই বলেছিলেন, শাসনকালে যে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়েছিল কংগ্রেস, তাতে ওই আসন পাওয়াও তাদের সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল। ওই সংখ্যার চেয়ে কম কিংবা কোনো আসন না পেলেও তাদের কিছুই করার ছিল না। সে হিসাবে প্রাপ্য ফলটা তাদের কর্মেরই ফল বলতে হবে।

তাহলে কংগ্রেসের টানা দুই মেয়াদের সেই অপশাসন কি এখনও ভুলতে পারেনি ভারতবাসী? গতবার নির্বাচনে দলকে জয়ী করতে হাল ধরেছিলেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী। এবারও তার হাতেই সেই দায়িত্ব ছিল। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন, তবে তার বা তার দলের নেতাদের সেই টোপ গেলেনি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির জনগণ। তারা বিজেপিকেই যোগ্য বলে রায় দিয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছিল, এবার হয়তো কংগ্রেস কোনো চমক দেখাবে। জোরেশোরে মাঠেও নামেন রাহুল। দলের হালে পানি ফেরাতে নেতাকর্মীদের দাবির মুখে প্রচারে যোগ দেন বোন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও। তবে সবকিছুই ভেসে গেল মোদিঝড়ে। কংগ্রেসের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এখনও মানুষ ভুলতে পারেনি, সেটি আবারও প্রমাণ হলো।

এবারও রাজধানী দিল্লিতে সাত আসনেই জয়ী হয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস দাঁড়াতেই পারেনি দলটির কাছে। রাজধানীতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টিরও (এএপি) শোচনীয় পরাজয় হয় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির কাছে। অথচ গতবার বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৭০ আসনের ৬৭টি পেয়েছিল কেজরিওয়ালের দল।

এবার লোকসভা নির্বাচনে সারাদেশের ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৫৪২টিতে ভোট হয়েছে। এতে বিজেপির আবারও জয়জয়কার হয়েছে। আর কংগ্রেসের সেই ভগ্নদশা। রাজ্যভিত্তিক ফলে কংগ্রেসের পরাজিত প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বী জয়ী প্রার্থীদের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে দেখা যায়, দলটির প্রার্থীরা বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে এবার ৪২ আসনের মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দুটি। গতবার পেয়েছিল চারটি। উত্তরাখন্ডে এবার পাঁচটি আসনের মধ্যে কোনোটিই পায়নি দলটি। উত্তরপ্রদেশে ৮০টি আসনের মধ্যে গতবার দুটি পেলেও এবার পেয়েছে একটি। ত্রিপুরায় দুটি আসনের একটিও পায়নি তারা। তেলেঙ্গানায় ১৭টি আসনের মধ্যে এবার চারটি পেলেও গতবার পেয়েছিল দুটি। তামিলনাড়ূতে ৩৮টি আসনের মধ্যে গতবার একটিও না পেলেও এবার পেয়েছে ৩৩টি। সিকিমে একটি আসন থাকলেও কংগ্রেসের কোনো প্রার্থী জয় পায়নি। রাজস্থানে ২৫টি আসনের মধ্যে একটিতেও জয় পায়নি রাহুলের দল। পাঞ্জাবে ১৩টি আসনের মধ্যে এবার ৮টিতে জয় পেয়েছে, গতবার পেয়েছিল তিনটিতে। পন্ডিচেরীতে একমাত্র আসনে গতবার জয় না পেলেও এবার জয় পেয়েছে। গতবারের মতো ওডিশাতে ২১টি আসনের মধ্যে একটিতেও জয় পায়নি। গতবারের মতো নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের একমাত্র আসনে এবারও জয় পায়নি রাহুলের দল। মেঘালয়ে দুটি আসনের মধ্যে গতবারের মতো এবারও একটি পেয়েছে। মণিপুরে গতবার দুটি আসনের দুটি পেলেও এবার একটিও পায়নি। মহারাষ্ট্রে ৪৮টি আসনের মধ্যে গতবার একটিও না পেলেও এবার পেয়েছে ৭টি। মধ্যপ্রদেশে ২৯টি আসনের মধ্যে গতবারের মতো এবারও দুটি পেয়েছে। লাক্ষাদ্বীপের একমাত্র আসন গতবার না পেলেও এবার সেটি পেয়েছে কংগ্রেস। কেরালার ২০টি আসনের মধ্যে গতবার ১১টি পেলেও এবার পেয়েছে ১৮টি। কর্ণাটকে ২৮টি আসনের মধ্যে গতবার ১১টি পেলেও এবার পেয়েছে দুটি। ঝাড়খন্ডে ১৪টি আসনের মধ্যে গতবারের মতো এবারও দুটি পেয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ৬টি আসনের মধ্যে গতবার একটিও না পেলেও এবার পেয়েছে তিনটি। হিমাচল প্রদেশে ৪টি আসনে গতবারের মতো এবার একটিও আসন পায়নি কংগ্রেস। হরিয়ানায় ১০টি আসনের মধ্যে গতবার একটি পেলেও এবার পায়নি। গুজরাটে ২৬টি আসনের মধ্যে এবারও কোনো আসন পায়নি। গোয়ায় দুটি আসনের মধ্যে গতবার কোনোটিই না পেলেও এবার পেয়েছে একটি।

দমন ও দিউ এবং দাদরা ও নগর হাভেলির একমাত্র আসনে এবারও জয়ী হতে পারেনি কংগ্রেস। ছত্তিশগড়ে ১১টি আসনের মধ্যে গতবার একটি পেলেও এবার পেয়েছে দুটি। চণ্ডীগড়ের একমাত্র আসনে গতবারের মতো এবারও ফেল করেছে দলটি। বিহারে ৪০ আসনের মধ্যে গতবার ৯টি পেলেও এবার পেয়েছে একটি। নাগরিক তালিকা নিয়ে আলোচিত আসাম রাজ্যে ১৪টি আসনের মধ্যে গতবারের মতো এবারও ৩টি পেয়েছে কংগ্রেস। অরুণাচলে দুটি আসনের মধ্যে গতবার একটি পেলেও এবারও শূন্য। অল্প্রব্দপ্রদেশে ২৫টি আসনের মধ্যে এবারও কোনো আসন পায়নি। এ ছাড়া আন্দামান ও নিকোবরের একমাত্র আসনে গতবার জয়ী না হলেও এবার জয় পেয়েছে রাহুলের দল। সূত্র :এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, বিবিসি, হিন্দুস্তান টাইমস ও আনন্দবাজার পত্রিকা।

Related posts