রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯ ♦ ২ ভাদ্র ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

খুবির স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ছাত্রীর রেজাল্টে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীকের সাথে শিক্ষকদের অনৈতিক আচরণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রোববার খুবির রেজিষ্ট্রার বরাবর এম.এ.ইন ইংলিশ কোর্সের-১৮ ব্যাচের ছাত্রী তুশমিত মেহেরুবা আঁকা ইংরেজি ডিসিপ্লিনের প্রধান ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে পরীক্ষার রেজাল্টে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে গত রোববার খুবির রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
তুশমিত মেহেরুবা আঁকার লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ২০১৭ সালে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিন থেকে স্নাতকের আট টার্মের প্রতিটি টার্মেই প্রথম হয়ে ৩.৫৯ সিজিপিএ সহ প্রথম স্থান অধিকার করে ¯œাতক সম্পন্ন করে। তার প্রাপ্ত সিজিপিএ ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইংরেজি ডিসিপ্লিনে ¯œাতকের সর্বোচ্চ স্কোর। তার ¯œাতকের ফলাফলের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আয়োজিত ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৭’ অর্জন করেন। তিনি ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ইংরেজি ডিসিপ্লিনের একবছরব্যাপী এম.এ. ইন ইংলিশ কোর্সের-১৮ ব্যাচে রেজিস্ট্রেশন করেন। ইংরেজি ডিসিপ্লিনের এম.এ. ইন ইংলিশ কোর্সের-১৮ ব্যাচের প্রোগ্রাম অনুযায়ী দু’টি টার্মের প্রথম টার্মে শিক্ষার্থীদের তাদের ¯œাতকের রেজাল্টের ভিত্তিতে থিসিস অথবা প্রজেক্টের জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে হয় এবং দ্বিতীয় টার্মে থিসিস বা প্রজেক্টের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। যে সকল শিক্ষার্থী ¯œাতকে ৩.৩০ বা তার অধিক সিজিপিএ পেয়েছে তাদের থিসিস এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীদের প্রজেক্ট করার সুযোগ দেয়া হয়। যে সকল শিক্ষার্থী থিসিস করার সিদ্ধান্ত নেয় তাদের থিসিসের ১০ ক্রেডিটসহ মোট ৩০ ক্রেডিট এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীদের ৪ ক্রেডিটের প্রজেক্টসহ মোট ৩২ ক্রেডিট পূরণ করতে হয়। ¯œাতকে ৩.৫৯ সিজিপিএ পাওয়ার সুবাদে আঁকা থিসিস করার সুযোগ পান। ডিসিপ্লিনের নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর থিসিস/প্রজেক্ট মূল্যায়নের জন্য একজন সুপারভাইজার, একজন ইন্টার্নাল, একজন এক্সটার্নাল এবং ডিসিপ্লিনের প্রধান সহযোগে মোট চারজন পরীক্ষকের একটি থিসিস/প্রজেক্ট কমিটি গঠিত হয়। মিটিংয়ে হওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আঁকার সুপারভাইজার হিসাবে ইংরেজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. সাবিহা হক, ইন্টার্নাল হিসাবে সহকারী অধ্যাপক হামালনা নিজাম ও এক্সটার্নাল হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন নির্ধারিত হন।
এম.এ.ইন.ইংলিশ ’১৮ ব্যাচের প্রথম টার্মে আঁকা ৩.৫৮ সিজিপিএ অর্জন করে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯ জুলাই থিসিস এবং প্রজেক্টের মিড-টার্ম ডিফেন্সে সুপারভাইজার ড. সাবিহা হক-এর তত্ত্বাবধায়নে আঁকা তার থিসিসের কাজের একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন। তার ভিত্তিতে ইন্টার্নাল হামালনা নিজাম, এক্সটার্নাল আব্দুল্লাহ আল মামুন ও ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামান তাকে কিছু পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী থিসিস সন্তোষজনক হওয়ায় ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর ড. সাবিহা হক থিসিসে স্বাক্ষর করেন। আকা ইন্টার্নাল, এক্সটার্নালের যথাযথ নামসহ থিসিসের চারটি কপি ডিসিপ্লিনের অফিসে জমা দেন। এরপর ২৬ ডিসেম্বর ইংরেজি ডিসিপ্লিন অফিস থেকে ফোন করে আঁকাকে জানানো হয় তার জমা দেয়া কাগজে ভুল ইন্টার্নালের নাম লেখা হয়েছে এবং অফিসে থাকা তথ্যানুযায়ী তার ইন্টার্নালের দায়িত্বে আছেন ডিসিপ্লিন প্রধান প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামান। ইন্টার্নাল সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করার সুপারভাইজার ড. সাবিহা হক-কে ফোন করা হলে তিনি আঁকাকে আশ্বস্ত করেন যে, তার ইন্টার্নাল পরিবর্তিত হয়নি এবং অফিস থেকে তাকে ভুল তথ্য জানানো হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ড. সাবিহা হক গত ২ জানুয়ারি আঁকাকে ফোন করে জানান তার ইন্টার্নালের দায়িত্ব হামালনা নিজাম থেকে পরিবর্তন করে প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানকে দেয়া হয়েছে। ড. সাবিহা হক আরো জানান ইন্টার্নাল পরিবর্তনের বিষয় সম্পর্কে তিনি নিজেও অবগত ছিলেন না এবং ব্যাপারটি তাঁর কাছেও বিস্ময়কর। ইতোমধ্যে ’১৮ ব্যাচের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে আঁকা জানতে পারে যে সে ছাড়া আর কোন শিক্ষার্থীর থিসিস কমিটিতে কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। এমনকি পূর্বে নির্ধারিত হওয়া ইন্টার্নাল হামালনা নিজাম শারিরীক অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন কারণে ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ডিসিপ্লিনে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতও ছিলেন না। যার কারণে ঐ শিক্ষার্থীর ইন্টার্নাল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
ডিফেন্সে অংশগ্রহণ করার জন্য আঁকা সুপারভাইজারের পরামর্শ চাইতে গেলে ড. সাবিহা হক তাকে ডিফেন্সে ইন্টার্নাল প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের কোন বিরূপ মন্তব্যের বিপরীতে কথা না বলে বিনাবাক্যব্যয়ে নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং তাঁর সাথে সম্মতি প্রকাশ করতে পরামর্শ দেন। ২০১৯ সালের ১২ জানুয়ারি ডিফেন্সে প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামান ইন্টার্নাল ও ডিসিপ্লিন প্রধান হিসেবে এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন এক্সটারনাল হিসেবে আমার জমা দেওয়া থিসিস এবং থিসিস প্রেজেন্টেশনের ভিত্তিতে ঐ শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করেন। থিসিসে উপস্থাপিত প্রতিটি তথ্য সুপারভাইজার কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও ডিফেন্স চলাকালীন সময়ে প্রফেসর ড. সাবিহা হক নিজেও তথ্যাবলির পক্ষে কোন যুক্তি প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন এবং আঁকা নিজেও সুপারভাইজারের কথামত সব মন্তব্য মেনে নেন।
ডিফেন্সের পরে ইন্টার্নাল, এক্সটার্নাল এবং ডিসিপ্লিন প্রধান কর্তৃক চিহ্নিত ভুল সংশোধনের জন্য সুপারভাইজারের সাথে দেখা করা হলে ড. সাবিহা হক ছাত্রী আঁকাকে জানান ইন্টার্নাল এবং এক্সটার্নালের সাথে চিন্তাধারার অমিলের কারণেই ছাত্রীর কাজ তাঁদের মনঃপুত হয়নি। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন থিসিসে প্রদত্ত তথ্যগুলি অবান্তর নয়। পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি সুপারভাইজারের স্বাক্ষরসহ সংশোধিত থিসিসের ৪টি কপি বাঁধাই করে ডিসিপ্লিন অফিসে জমা দেয়া হয় এবং সংশোধিত কপিতে ইন্টার্নাল হিসাবে প্রফেসর ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের নাম প্রদান করা হয়।
গত ২৪ জানুয়ারি এম.এ.ইন.ইংলিশ ’১৮ ব্যাচের দ্বিতীয় টার্ম এবং দুই টার্মের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলে জানা যায় আঁকা দ্বিতীয় টার্মে ৩.৩৯ টিজিপিএ (টার্ম গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ) এবং মাস্টার্সের দুই টার্মের রেজাল্টের ভিত্তিতে ৩.৪৭ সিজিপিএ অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে। দ্বিতীয় টার্মে প্রথম স্থান লাভকারীর প্রাপ্ত টিজিপিএ ৩.৭২ এবং মাস্টার্সের দুই টার্মের রেজাল্টের ভিত্তিতে প্রথম স্থান লাভকারীর প্রাপ্ত সিজিপিএ ৩.৫০। সুপারভাইজার, ইন্টার্নাল, এক্সটার্নাল এবং ডিসিপ্লিন প্রধানের প্রদত্ত নম্বরের ভিত্তিতে থিসিসে তাকে গ্রেড পয়েন্ট ৩.৫০ দেয়া হয়। যা তার দ্বিতীয় টার্ম তথা সমগ্র মাস্টার্সের রেজাল্টে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, ২০০২ সালের ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে ইংরেজি ডিসিপ্লিনের প্রধান ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ঐ তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ পান এবং ইংরেজি ডিসিপ্লিনের প্রধান থেকে সাসপেন্ড করেন। এমনকি সাসপেন্ডের পাশাপাশি ভর্তি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ থেকে তাকে তিন বছর বিরত রাখা হয়।
অভিযোগে আরো জানা যায়, ডিসিপ্লিনের পিয়ন ফজর আলীকে ড. আহমেদ আহসানুজ্জামান মারধর করে আহত করে। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ খবর তখন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ পাওয়া রয়েছে।
অভিযোগকারী ছাত্রী তুশমিত মেহেরুবা আঁকা বলেন, মাস্টার্স-এ যাতে সে প্রথম স্থান অধিকার করতে না পারে সে জন্য এ কাজগুলো হয়েছে। যা কোন শিক্ষার্থীর জন্য কাম্য নয়। ডিসিপ্লিনের কোন শিক্ষকের প্রতি কোন অসম্মানজনক আচরণ না করার পরেও তার সাথে কেন এমন নেতিবাচক ঘটনা ঘটল সেটি তার নিজের কাছেও বোধগম্য নয়।
খুবির ইংরেজি ডিসিপ্লিনে এর আগেও ব্যাচের প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীর সাথে অনিয়মের নজির আছে। সম্মান ’১১ ব্যাচের প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীকে ফাইনাল টার্মের প্রজেক্টে প্লাজিয়ারিজমের দোহাই দিয়ে শর্ট টার্ম দেয়া হয়। এর ফলে সে নিজের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথে স্নাতক শেষ করতে ব্যর্থ হয় এবং যথাসময়ে মাস্টার্সেও ভর্তি হতে পারে না। সেই ব্যাচের-ই অন্য একজন শিক্ষার্থী বর্তমানে ডিসিপ্লিনে লেকচারার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত আছে। এছাড়া ডিসিপ্লিন প্রধান ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের নামে বিভিন্ন সময়ে নিজের স্টাফকে মারধর করে গুরুতর আহত করা এবং ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
খুবির ইংরেজি ডিসিপ্লিন প্রধান ড. আহমেদ আহসানুজ্জামানের ০১৭১৫-৩৮৭৮৬৮ নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন এ সব বিষয় নিয়ে প্রেসে কোন মন্তব্য করব না।
খুবির রেজিষ্ট্রার প্রফেসর রুহুল কুদ্দুস বলেন, আঁকার লিখিত অভিযোগটি পেয়েছি। আমরা বসে অভিযোগের ব্যাপারে সমাধান করা হবে।
খুবির উপাচার্য প্রফেসর ড. ফায়েক উজ্জামান বলেন, রেজিস্ট্রার আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ইংরেজি ডিসিপ্লিনের ছাত্রী তুশমিত মেহেরুবা আঁকার একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। অভিযোগ আমার হাতে পৌঁছালে আমি দেখব রেজাল্টে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়েছে কী না। প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Related posts