বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

কেসিসির ১৪শ’ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু

স্টাফ রিপোর্টার: খুলনা নগরবাসীর প্রধান যন্ত্রনার নাম জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতার কারণে সামন্য বৃষ্টিতেই নগরীর রাস্তাঘাট জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অধিকাংশ সড়ক ডুবে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। গত বছর ১৫ মে নির্বাচনে প্রায় ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী তালুকদার আব্দুল খালেক। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রধান ছিলো নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করা। আর মেয়র পদে নির্বাচিত হওয়ার পর ক্ষমতা গ্রহণের দেড় মাস আগেই তিনি প্রায় ১৪শ’ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এর মধ্যে খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পে ৬০৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এ অর্থের প্রথম ধাপে খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পে ৪০ কোটি টাকা মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় হয়েছে। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে এ অর্থ সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা হবে। তবে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্প ঃ সিটি করপোরেশন দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ৬০৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ৫১৩টি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ৬০টিসহ মোট ৫৭৩টি সড়ক সংস্কার করা হবে। ৭৮ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং, ১৬৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার সড়ক আরসিসি ঢালাই এবং ৩৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার সড়কে সিসি ঢালাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। কার্পেটিং সড়কগুলোতে ২৩৮ কোটি, আরসিসি ঢালাই সড়কগুলোতে ৩০৩ কোটি এবং সিসি ঢালাই সড়কগুলোতে ৩৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। রাস্তা সংস্কার ছাড়াও ভাস্কর্য, ঝর্ণা, চারা গাছরোপণ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭ কেটি ৫৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে চলতি অর্থ বছরে ৪০ কোটি টাকা ছাড় পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অচীরেই কাজ শুরু হবে।

খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প ঃ এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। সরকারী অর্থায়নে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় মৃতপ্রায় ময়ূর নদীসহ ৯টি খাল খনন ও পাড় বাঁধাই, প্রাইমারি ড্রেন, সেকেন্ডারি ড্রেন, স্লুইচ গেট, পাম্প হাউস, ব্রিজ নির্মাণ কাজ রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০১৯- ২০২৩ পর্যন্ত। এ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুগম হবে। নিরসন হবে জলাবদ্ধতা সমস্যা। মৃত ময়ূর নদীতে প্রাণ সঞ্চারিত হবে ।

সূত্র জানায়, প্রায় তিন দশক আগে বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের আলুতলা নামক স্থানে কাজিবাছা নদীর শাখা নদী হাতিয়ার মুখে ক্লোজার নির্মাণ করা হয়। ক্লোজারের অপারেশনাল কাজ যথাযথভাবে না হওয়ায় হাতিয়া ও তার সংযোগ নদী ময়ূরের অপমৃত্যু ঘটতে থাকে। এ দুইটি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোতেও পানি প্রবাহ না থাকায় তা ভরাট হয়ে যায়। অবৈধ দখলদারদের কব্জায়ও চলে যায় ময়ূর নদী ও খালের বিভিন্ন জায়গা। খুলনা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদ, রূপসা নদী এবং হাতিয়া ও ময়ূর নদীতে নগরীর পানি নিষ্কাশিত হয়ে থাকে। ভৈরব ও রূপসায় ¯্রােতধারা থাকলেও এক সময়ের খর¯্রােতা ময়ূর নদী এখন মৃত। হাতিয়া নদী ইতিপূর্বে খনন করায় এর অবস্থা কিছুটা ভাল হলেও ময়ূর নদী ও খালগুলোর দুরবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনে তেমন কোন উন্নতি হয়নি। দখল ও দূষণে ময়ূর নদীর অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। ময়ুর ও হাতিয়া নদী এবং সংযোগ খাল থেকে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় বৃষ্টির দিনে খুলনা শহরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদীসহ ৯টি খাল খনন করা হবে। এর মধ্যে ময়ূর নদী ও খুদে খাল খনন এবং ক্ষেত্রখালী খাল, ছড়িছড়া খাল, হরিণটানা খাল, নারকেলবাড়িয়া খাল, তালতলা খাল, তালতলা সংযোগ খাল ও লবণচরা ২নং স্লুইচ গেট খাল খনন ও পাড় বাঁধাই করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৬২.৯৪ কিলোমিটার প্রাইমারি ড্রেন, ১২৯.৪২ কিলোমিটার সেকেন্ডারি ড্রেন, ৮টি স্লুইচ গেট নির্মাণ, আউটলেট খনন ও পাড় বাঁধাই করা হবে। নতুন নর্দমা সৃষ্টি করে শহরের মধ্য হতে নদী কিংবা খালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ৪.৪৮ একর জমি অধিগ্রহণ, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়, ময়ূর নদীর ওপর ৩টি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের পরামর্শক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

কেসিসি’র চীফ প্লানিং অফিসার আবির-উল-জব্বার বলেন, খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই কনসালটেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের পর কনসালটেন্ট এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞ টিম নক্সা তৈরি করবে। এরপর টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে নক্সা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া লবণচরা ও মুজগুন্নী এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদে খাল ও রূপসা এলাকা থেকে পানি নিস্কাশনে নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হবে।

কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল ইসলাম জানান, ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকার খুলনা মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদসহ গুরুত্বপূর্ণ ৯টি খাল খনন করে পাড় বাঁধাই করা হবে। নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ৮টি স্লুইচগেট পুনর্নিমাণ করা হবে। এ ছাড়া নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ৯টি প্রধান সড়কের দুই পাশে ৬২ কিলোমিটার বড় ড্রেন এবং ১২৮ কিলোমিটার এলাকায় ছোট ড্রেন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদের ওপর ৩টি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের পর পুরোদমে কাজ শুরু হবে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারী অর্থায়নে খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন খুব শীঘ্রই অবৈধ স্থাপনা ও দখলদার উচ্ছেদ করা হবে। এ বছর স্বল্প পরিসরে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হচ্ছে। আগামী বছরে বেশী বরাদ্দ পাওয়া যাবে, ফলে আগামী বছর থেকে পুরোদমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলবে।

Related posts