শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

ওষুধের পরিবর্তে জনপ্রিয় হচ্ছে ফিজিওথেরাপি

রাজবংশী রায়

ওষুধের ব্যবহার কমিয়ে মাংসপেশি, হাড় ও কোমরের ব্যথা, প্যারালাইসিস, আর্থ্রাইটিস, পঙ্গুত্বসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্তদের পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি চিকিসা পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বজুড়ে এ চিকিসা পদ্ধতির চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশেও এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আধুনিক চিকিসাবিজ্ঞানীদের মতে, বাত ও ব্যথা চিকিসায় কিছু ভিটামিন ছাড়া ব্যথানাশক যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পেপটিক আলসারসহ কিডনি পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে এসব ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। তাই বাতব্যথা ও প্যারালাইসিস চিকিসায় ফিজিওথেরাপিই বর্তমানে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন একমাত্র উন্নত চিকিসা পদ্ধতি।

ব্যথায় আক্রান্ত ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ সঠিক চিকিসা পাচ্ছেন না বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রতি পাঁচজনে একজন মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় ভুগছে। ব্যথায় আক্রান্ত ৪৯ শতাংশ মানুষকে জোরপূর্বক কাজে অংশ নিতে হচ্ছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ আংশিক অথবা পুরোপুরি প্রতিবন্ধিতায় ভুগছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় ফিজিওথেরাপিই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন প্রধান চিকিসা’।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ দিন দিন বেড়ে চলছে। দীর্ঘস্থায়ী এসব রোগের চিকিসায় ফিজিওথেরাপি ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু শারীরিক কার্যক্রম বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু মানুষ শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করেন না। এ কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফিজিওথেরাপি চিকিসার প্রসার জরুরি।

তিনি বলেন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এই চিকিসা পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ, ওষুধের ব্যবহার কমিয়ে বিভিন্ন শারীরিক কার্যক্রম ও ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ ও সচল জীবনযাপন করা সম্ভব।

ডা. জাহিদুল বলেন, দেশে ফিজিক্যাল মেডিসিন চিকিসা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ওষুধের পরিবর্তে অনেকেই এখন ফিজিওথেরাপি চিকিসা গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ফিজিওথেরাপি নিতে শত শত মানুষ ভিড় করছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ কে এম সালেক বলেন, বাত, কোমর, মেরুদণ্ড, ঘাড়, ক্রীড়াপাত, পক্ষাঘাত ও মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ফিজিওথেরাপি নেওয়া প্রয়োজন। এসব সমস্যায় আক্রান্তই ফিজিওথেরাপির জন্য ভিড় করছে। এই ভিড় সামলাতে সংশ্নিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ফিজিওথেরাপির ইতিহাস: নিউজিল্যান্ডের একদল স্বাস্থ্যকর্মী ১৯১৩ সালে চিকিসাসেবায় প্রথমবারের মতো ফিজিওথেরাপি পদ্ধতির ব্যবহার শুরু করেন। এরপর বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি উন্নত বিশ্বে পঙ্গুত্ব ও প্যারালাইসিস চিকিসায় ফিজিওথেরাপি স্থান করে নেয়। এরপর ধাপে ধাপে ফিজিওথেরাপি চিকিসায় হাইড্রোথেরাপি, ক্রায়োথেরাপি ও কাইনেশিওলজি যুক্ত হয়। ১৯৮০ সালের দিকে ফিজিওথেরাপি চিকিসায় ইলেকট্রোথেরাপি যুক্ত হয়। এভাবেই বাতের ব্যথা, প্যারালাইসিস, স্পোর্টস ইনজুরিসহ পঙ্গু ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে চিকিসাবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হিসেবে স্থান করে নেয় ফিজিওথেরাপি।

ফিজিওথেরাপি চিকিসা-সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৬০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অধ্যাপক আবুল হোসেনের হাত ধরে বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিসা আত্মপ্রকাশ করে। ওই বছরই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রথম প্রতিবন্ধী শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপি চিকিসা কার্যক্রম শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. আর জে গারস্ট যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ফিজিওথেরাপি বিভাগ ও স্নাতকোত্তর অর্থোপেডিকস কোর্সের সঙ্গে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু করেন। এই পেশার চিকিসকরা বাত-ব্যথা, প্যারালাইসিস, স্পোর্টস ইনজুরি, অটিজমসহ অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, স্ট্রোক, অসংক্রামক ব্যাধি, আর্থ্রাইটিস, অর্থোপেডিকস কন্ডিশন ও প্রতিবন্ধিতার ফিজিওথেরাপি চিকিসা প্রদান করে আসছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেশে সাতটি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক কোর্স চালু আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দুই হাজার শিক্ষার্থী ও প্রায় তিন হাজার পেশাদার স্নাতক ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছেন।

আছে দ্বন্দ্বও: আশির দশকে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম বিএসএমএমইউতে ফিজিক্যাল মেডিসিনে এফসিপিএস কোর্স চালু করেন। এর পর থেকেই ফিজিক্যাল মেডিসিন ও ফিজিওথেরাপিস্টদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফিজিওথেরাপি চিকিসার সঙ্গে যুক্তরা নামের আগে ‘ডাক্তার’ লিখতে চান। অন্যদিকে ফিজিক্যাল মেডিসিনের চিকিসকরা এর চরম বিরোধিতা করছেন। তাদের বক্তব্য, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী এমবিবিএস এবং বিডিএস ডিগ্রি অর্জন ছাড়া অন্য কেউ ‘ডাক্তার’ লিখতে পারবেন না।

বিএমডিসির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সহিদুল্লাও একই মত দেন। তিনি বলেন, এমবিবিএস ও বিডিএস ডিগ্রিধারী ছাড়া অন্য কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখলে তা অনৈতিক ও অবৈধ।

তবে ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দলিলুর রহমান বলেন, হোমিওপ্যাথিক চিকিসার সঙ্গে যুক্তরা নামের আগে ‘ডাক্তার’ লিখে চলেছেন। তাহলে ফিজিওথেরাপির চিকিসার সঙ্গে যুক্তরা কেন পারবেন না? এ ধরনের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর।

কর্মসূচি: দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রাসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হবে। সকালে নিটোরের সামনে থেকে শোভাযাত্রা বের করা হবে।

Related posts