সোমবার, ২৭ মে ২০১৯ ♦ ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

Select your Top Menu from wp menus

এসেছে মধুমাস- সুমিষ্ট দেশী রসালো ফলের

মোরসালিন মিজান ॥ একটি মাসকে আলাদা করে মধুমাস বলা হচ্ছে। কী দারুণ ব্যাপার! কারণও আছে। এ মাসেই পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি টাটকা রসালো দেশী ফল। সারাবছর একই স্বাদের আপেল। আঙ্গুর। বাইরে থেকে আমদানি করা বাসি ফল খেতে হয়, তাই খাওয়া। তবে বাংলাদেশের ফল বলতে আম জাম কলা কাঁঠাল আনারস…। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এসব ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। কারণ আজ থেকে শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠ। হ্যাঁ, জ্যৈষ্ঠরই আরেক নাম মধুমাস। এ মাসের অবদান সুস্বাদু রসালো ফল।
গ্রীষ্মের গরমে যখন প্রাণ যায় অবস্থা, যখন ভেতরে তৃষ্ণা বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেছে তখন মধুমাসের ফল প্রকৃতির বিরাট দান হয়ে এসেছে। দেহের ভেতরে এ কদিনে যে খড়া দেখা দিয়েছে মধুমাস তা দূর করবে বলেই আশা। ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে লিচু কাঁঠাল আনারস জামরুল তালের শাঁশসহ কিছু রসালো ফল। আর রাজশাহীর আম গাছ থেকে পাড়া শুরু হবে আজ থেকে। সব মিলিয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজার জমে উঠবে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে ঢুকছে মধুমাসের ফল। সদ্য গাছ থেকে নামানো ফলের ঘ্রাণও বিশেষ আকর্ষণ করে। ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাদামতলী। সারাদেশে উৎপাদিত ফল নদী পথে এখানে আসছে। এখান থেকে চলে যাচ্ছে খুচরা বাজারে। বাদামতলীর পাইকারি ব্যবসায়ী আমিনুল জানান, এখন লিচু কাঁঠাল আনারস বেশি আসছে। তবে আগামী ১০ থেকে ২০ দিনের মধ্যে জ্যৈষ্ঠের সব ফল বাজারে চলে আসবে। এখন দাম একটু বেশি থাকলেও, যোগান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমবে বলে জানান তিনি।
কাওরানবাজারেও বিশাল বিশাল আড়ত। প্রতিদিন রাতে ট্রাক ভর্তি করে ফল আসছে। খুচরা বিক্রেতারা সেখান থেকে কিনছেন। এভাবে ফল চলে যাচ্ছে পাড়া মহল্লায়। মধুমাসের ফলগুলোর মধ্যে লিচুর চাহিদা তুঙ্গে। রসালো এ ফল গত কয়েকদিন ধরেই বাজারে আছে। মঙ্গলবার কাওরানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি আড়তের সামনে লিচুর লম্বা সরু পাতার স্তূপ। দেখে বোঝা যায়, যোগান নেহায়েত কম নয়। কোথাও পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। কোথাও বা খুচরা। বিক্রেতারা জানান, এগুলো মূলত সোনারগাঁওয়ের লিচু। জ্যৈষ্ঠ শুরুর আগেই সোনারগাঁওয়ের লিচু বাজারে প্রবেশ করেছিল। আকারে খুব বড় নয়। একটু টক। এরপরও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। বাজারে আছে মাগুরার লিচুও। মৌসুমের প্রথম লিচু বলে কথা, এগুলোও ভাল বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা বাজারে একশ’ লিচুর দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। ঈশ্বরদীর লিচুও আসতে শুরু করেছে। দোকানিদের ভাষায় ‘হালকা পাতলা।’
কিরণ ট্রেডার্স নামের একটি আড়তে কথা হচ্ছিল বাবু নামের এক পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, এবারও ময়মনসিংহ গাজীপুর কাপাসিয়া এলাকায় প্রচুর লিচু হয়েছে। ঈদের আগে আগে বাজারে উঠবে। তবে দিনাজপুর ও রাজশাহীর লিচু লিচুর রাজা। দারুণ মিষ্টি। রসালো। ঈদের পর এসব জাত বাজারে আসবে বলে জানান তিনি। সবচেয়ে বড় আকারের মিষ্টি লিচুটি ‘বোম্বাই লিচু’ নামে পরিচিত। এটিও প্রায় একই সময় বাজারে আসার কথা রয়েছে।
আমের চাহিদা অনেক বেশি হলেও, পরিমাণে কম। ফলটি সবে বাজারে আসতে শুরু করেছে। দোকানিরা ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে আমের ভেতরটা দৃশ্যমান করছেন। একে বলা হচ্ছে ‘স্যাম্পল’। ‘স্যাম্পল’ দেখে বোঝা যায়, এখনও ঠিক খাওয়ার মতো হয়নি।
শফিকুল ইসলাম নামের এক বিক্রেতা স্বীকার করে নিয়ে বললেন, এখন আম একটু টক হবে। তরকারি করে খাওয়ার মতো। তবে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১০ তারিখ থেকে পাকা আম পাওয়া যাবে। অপর বিক্রেতা জসিম বললেন, প্রথমে আসবে গোপাল। পরে হিমসাগর। এভাবে একের পর এক আম আসতেই থাকবে। বর্তমানে বেশিরভাগ আম সাতক্ষীরা থেকে আসছে বলে জানান তিনি।
তবে রাজশাহীর আমই সেরা। সবাই এ আমের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকার বাজারে এ আম ওঠেনি। তবে আজ বুধবার থেকে রাজশাহীতে আম ভাঙ্গা শুরু হচ্ছে বলে জানা গেছে। পর্যায়ক্রমে সাত ধাপে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু পরিপক্ব আম গাছ থেকে পাড়া হবে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে রবিবার আয়োজিত এক বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সে অনুযায়ী, আজ ১৫ মে থেকে গুটি আম নামাতে পারবেন চাষীরা। ২০ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে রানীপছন্দ পাড়া হবে। ২৮ মে থেকে পাড়া হবে হিমসাগর। ২৬ মে থেকে লক্ষণভোগ নামানোর কথা। এছাড়া ল্যাংড়া আম ৬ জুন, আম্রপালি ও ফজলি আম ১৬ জুন থেকে নামানো হবে। সবশেষে আসবে আশ্বিনা জাতের আম। এই জাতটি ১৭ জুলাই নাগাদ পাওয়া যেতে পারে বলে আড়তদাররা জানিয়েছেন।
জাতীয় ফল কাঁঠাল নিয়েও আগ্রহের শেষ নেই। বাজারে আছে ফলটি। টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ থেকে আসা কাঁঠাল আকারে ছোট। গোলাকার দেখতে। আড়তদার তোতা মিয়া জানান, এক সপ্তাহের মতো হয়েছে কাঁঠাল এসেছে। টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জের কাঁঠাল দিয়ে মৌসুমের শুরু হয়েছে। কয়েকদিন পর জামালপুর শেরপুর ও ময়মনসিংহের কাঁঠাল পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
অবশ্য তারও অনেক আগে থেকে বাজারে এসেছে আনারস। জোগানটা বেশ ভাল বলেই ভাল মনে হয়। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তার ধারে ছোট ছোট আনারস কেটে লবণ আর মরিচগুঁড়ো মাখিয়ে পরিবেশন করছেন বিক্রেতারা। দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন যেসব আনারস পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো রাঙ্গামাটি ও শ্রীমঙ্গলের। আকারে একেবারেই ছোট। তবে ভারি মিষ্টি। রসালো। প্রতিটি আনারসের খুচরা মূল্য ১৫ থেকে ২০ টাকা।
তালও মধুমাসের ফল। ইতোমধ্যে বাজারে এসেছে। ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে তালের শাঁশ বের করে খাওয়াচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ঢাকার প্রায় বিভিন্ন রাস্তার ধারে দেখা যাচ্ছে এমন দৃশ্য। সাতক্ষীরা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল থেকে আসা তালের শাঁশ গরমে বেশ কার্যকর।
জাম এখনও চোখে পড়েনি। জামরুল পাওয়া যাচ্ছে। জোগান বেশ ভাল। বিভিন্ন দোকানে সুন্দর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। লাল সাদাসহ তিনটি রং। দেখতে বেশ লাগে। তরমুজও বাজারে আছে। আছে আরও কিছু ফল। বাকিগুলো ক্রমে আসবে।
এদিকে, মধুমাসের নতুন ফলে ঢাকার অলিগলির দোকানগুলোয় ভরে উঠেছে। মঙ্গলবার বিজয় সরণীতে দেখা গেল এক বিক্রেতা সোনারগাঁওয়ের লিচু দিনাজপুরের বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। ক্রেতারা অবশ্য এসব কথার ফাঁকি ধরতে পারেন। শোয়েব নামের এক ক্রেতা বলছিলেন, দিনাজপুরের কথা বললে দাম বেশি পাওয়া যাবে। তাই এসব বলছেন। আসলে এগুলো সোনারগাঁওয়ের। মৌসুমের প্রথম লিচু আগে ভাগে মুখে দেয়াই বড় কথা। টক না মিষ্টি সে কথা পরে হবে বলে হা হা করে হেসে ওঠেন তিনি।
কলাবাগানের একটি দোকান থেকে ফল কিনছিলেন আশরাফুল আলম। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, মধুমাসের ফল আসতেই বাইরের ফল আর লোকে কিনছে না। দেশী নতুন ফল কী আসছে সেই খোঁজ নিচ্ছে। আমিও তা-ই করছি। দাম একটু বেশি মন্তব্য করলেও তিনি বলেন, এখন ফল খাওয়ার সময়। সময়ের ফল সময়ে না খেলে শরীরের খরা দূর হবে না। তাই বেশি বেশি দেশীয় ফল কেনার কথা জানান তিনি। ( দৈনিক জনকন্ঠের সৌজন্যে)।

Related posts